নন্দীগ্রাম আজও কিছু বলতে চায়!
২০০৭ সালটা এ রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে ভুলবার নয়। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার হঠাৎ শিল্পমতি হয়ে উঠেছিল কেন, তা নিশ্চয়ই বিতর্কের বিষয়। কিন্তু এ নিয়ে কোনও সংশয় নেই যে, ইন্দোনেশীয় শিল্পপতির প্রেমের ঠেলায় হিতাহিত জ্ঞান হারিয়েছিলেন সে-সময়কার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তাঁর একবগ্গা শিল্পনীতি রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষিজীবী মহলে। অগণিত চাষির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে এগোতে চাইছিলেন তিনি। এরই জেরে পূর্ব মেদিনীপুরের শান্তস্নিগ্ধ নন্দীগ্রাম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল বারুদের গন্ধে, আন্দোলনের তীব্রতায়, মৃত্যুর হাহাকারে।
কেমিক্যাল হাব নির্মাণের জন্য নন্দীগ্রামের অতি উর্বর ১০ হাজার একর জমি সালেম গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিতে চেয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। অথচ ওই পরিমাণ বিস্তৃত জমি অধিগ্রহণে এতটাই উগ্র-উদ্ধত-উদগ্রীব ও ব্যগ্র-ব্যাকুল-বেয়াদব হয়ে পড়েছিল তারা যে, বহুকালের ‘কৃষকবন্ধু’ ইমেজ রক্ষার তাগিদেও আলাপ-আলোচনার দায় অনুভব করেনি!
ফল যা হওয়ার, ঘটেও ছিল তা-ই। ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরক্ষা কমিটির নেতৃত্বে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন নন্দীগ্রামবাসী। সেই বিক্ষোভ-আন্দোলনের পাশে সক্রিয় হলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটু একটু করে উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল নন্দীগ্রাম, খেজুরিতে। ঘটছিল দমনপীড়ন, চোরাগোপ্তা খুন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। ওই বছরেরই ১৪ মার্চ পরিস্থিতি চরম রূপ নেয়। তৎকালীন বাম সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশ মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে হাজার হাজার পুলিশ গ্রামে ঢোকে। অভিযোগ, পুলিশের পোশাকে ঢোকে ‘হার্মাদ’ বাহিনীও। বাধা পেয়ে গুলি চালায় তারা। রক্তে ভেসে যায় নন্দীগ্রামের মাটি। ঝরে যায় ১৪টি প্রাণ। সেই ঘটনার অভিঘাতে বিদ্বজনেরা পথে নামেন। গর্জে ওঠেন প্রতিবাদে। সে-সময়কার রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ‘হাড় হিম করা’ সেই ‘সন্ত্রাসে’র সঙ্গে তুলনা টানেন জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের।
১৪ শহিদের মূল্যে তৈরি হওয়া প্রতিরোধে সাময়িক পিছু হঠতে বাধ্য হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বিমান বসু, নিরুপম সেনরা। কিন্তু নভেম্বর পড়তেই আবার ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে হাওয়ায়। আজকের দিনে, ১০ নভেম্বর, নন্দীগ্রামে কৃষিজীবী ও কৃষি আন্দোলনকারীদের নিরস্ত্র পদযাত্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সিপিএম! চরম বর্বর নিশংসতায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় নন্দীগ্রামের হৃদয়! সেই নির্মম অন্ধ আক্রমণে প্রাণহানির যথার্থ হিসেব আজও অমীমাংসিত। ঘটনায় বুদ্ধদেবের মুখে ফুটে উঠেছিল বাঁকা হাসি। নন্দীগ্রামের উদ্দেশে ভুল ইংরেজিতে তিনি বলেছিলেন, ‘They have (been) paid back in the same coin.’ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান তথা তৎকালীন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বিমান বসু ঘটনাকে বর্ণনা করেছিলেন ‘নন্দীগ্রামে সূর্যোদয়’ বলে! দলের অন্যান্য মাথারাও ভিন্নমত হননি সে’দিন। কেবল রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর খেদোক্তি বেজে উঠেছিল ‘মলিন দীপাবলি’র অন্ধকারে।
পরিণাম বামেদের পক্ষেই হয়েছে বিষময়। পশ্চিমবঙ্গের একেবারে দক্ষিণে তিন-ফসলা কৃষিজমি জলের পরিবর্তে রক্তে ভিজিয়ে দেওয়ার কনসিকোয়েন্স: গোটা রাজ্য থেকেই বামশক্তিকে উৎখাত। আজ সে’শক্তি টিভি চ্যানেলের টক শো, সামাজিক মাধ্যমের স্বশাসিত টাইমলাইন আর আদালত চত্বরের স্বল্পমেয়াদী প্যাঁচ-পয়জারের বাইরে আক্ষরিক অর্থে শূন্যে বিলীন!
উলটোদিকে অন্ধকারও অবশ্য কিছু কম নয়। সে’দিনের নন্দীগ্রাম আন্দোলনে পরিচিতির আলোয় উঠে আসা শুভেন্দু অধিকারী এখন শুধু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি নেতা নন, তিনিই বর্তমান বিরোধী দলনেতা। বামফ্রন্টকে সরিয়ে যে তৃণমূলের উপর আস্থা রেখেছিলেন রাজ্যবাসী, সেই ঘাসফুলের সরকার আজ একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ-নাজেহাল। শিক্ষা থেকে রেশন, একাধিক কেলেঙ্কারির মামলায় কারাগারে নেতামন্ত্রীরা। গত কয়েক বছরের মতো এবারের ১০ নভেম্বরও তাই কোথাও যেন বড় ম্লান, বড্ড বেশি ম্রিয়মাণ!
আজ সারাদিন নন্দীগ্রামের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের নামে চলল কুণাল-শুভেন্দু তরজা! বিরোধী দলনেতার সঙ্গে তৃণমূল রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের সেই বাগবিতণ্ডার মানও পরস্পরকে কালিমালিপ্ত করার ঊর্ধ্বে উঠল না। শুধু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সচিত্র শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পোস্ট ‘স্মৃতিবেদনার মালা’ হয়ে ঝুলে রইল সামাজিক মাধ্যমে।


তবু নন্দীগ্রাম নিশ্চয়ই আজও হার-না-মানার আদর্শে একনিষ্ঠ। হয়ত এই দিনটিতে শহিদ পরিবারের কোনও শিশুকে তার মা চিনিয়ে দিলেন মেঠো পথের সেই পুরোনো বাঁকটা, যেখানে ১৬ বছর আগে গুলির শব্দে ঘোষিত হয়েছিল মৃত্যুপরোয়ানা! চোখের জল চোখে রেখে জননী তাঁর সন্তানকে চেনালেন ‘উৎসর্গ’। নবীন প্রজন্মের নরম হাত হয়ত শক্ত হয়ে এলো। তার অবিকশিত চোয়াল দৃঢ় হয়ে উঠল কোন অঙ্গীকারে? উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।
আপাতত নন্দীগ্রামের শস্যসবুজ মাঠে সান্ত্বনার মতো হিমের আলপনা! কৃষিজমি এখনও আগের মতই অক্ষত, উর্বর! সেও কি শহিদ স্মরণ দিবসের সবিশেষ সার্থকতা নয়?
©’poor peasants tortured by the CPI M’|Jonoikobangali|Ramsey_Clark|
15 January 2009|GNU Free Documentation License|Cover Image
