হলুদে নিষ্প্রভ নীল, তবুও হৃদয়…
বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০২৩-এর ফাইনাল ম্যাচের আগে অজি অধিনায়ক কামিন্স মন্তব্য করেছিলেন, ‘গ্যালারি ভর্তি লক্ষাধিক ভারতীয় সমর্থকের গর্জন থামিয়ে দেওয়ার মজাটাই আলাদা!’ হ্যাঁ, কার্যক্ষেত্রেও সেটাই ঘটালেন তিনি। এবং সেই ‘বিশেষ মজা’ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন। কামিন্সের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারত অধিনায়ক রোহিত শর্মা বলেছিলেন, ‘উনি কী ভেবে কী বলেছেন, জানি না। আমরা আমাদের কাজে মন দিতে চাই।’ কার্যক্ষেত্রেও কাজে মন নিশ্চয়ই দিলেন রোহিত; কিন্তু কাজের কাজ কিছু হল না। ভারতের মাটি থেকে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল অস্ট্রেলিয়া! হাতের নাগালে এসেও অধরা রয়ে গেল বিশ্বকাপ।

নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের পিচ কিউরেটর আশিস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ‘প্রথমে ব্যাটিং হলে ৩১৫ রান হবে ঝুঁকিহীন।’ তখনই বোঝা গিয়েছিল মোতেরার পিচে কোনও ‘জুজু’ নেই—অর্থাৎ, ব্যাটাররা যথেষ্ট আনুকূল্য পাবেন, বিশেষত রান তাড়া করার ক্ষেত্রে। অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক কামিন্স বুঝেছিলেন, ‘শুকনো উইকেট। রাতে হিম পড়লে পিচের প্রকৃতি বদলাবে। গতি কমবে বলের।’ ফলে টসে জেতার পর প্রথমে ফিল্ডিং নিতে দু’বার ভাবেননি।
কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো হাইভোল্টেজ ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে রানের পাহাড় গড়ার পরিবর্তে শুরু থেকেই একের পর এক বিপর্যয় ডেকে আনেন ভারতীয় ব্যাটাররা। পঞ্চম ওভারে স্টার্কের দ্বিতীয় বলে জাম্পার হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে ব্যক্তিগত ৪ রানের মাথায় প্যাভিলিয়নে ফেরেন শুভমান গিল। তবু স্বভাবোচিত ঝোড়ো মেজাজে ইনিংস টানছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক। কিন্তু ম্যাক্সওয়েলের বলে হেডের ক্ষিপ্র হাতে ধরা পড়েন রোহিত শর্মা (৪৭)। ম্যাচ তখন ১০ ওভার ৪ বল পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে শ্রেয়স আইয়ার কী করলেন! ঠিক পরের ওভারে কামিন্সের দ্বিতীয় ডেলিভারিতে সোজা ইংলিসের জিম্মায় বল তুলে দিলেন তিনি! তাঁর নিজের নামের পাশে তখন একটা বাউন্ডারির সৌজন্যে মাত্র চার রান!
স্বভাবত ব্যাকফুটে চলে যেতে বাধ্য হয় ভারত। অবস্থা বুঝে কিছুটা রক্ষণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান বিরাট কোহলি ও কেএল রাহুল। কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল ম্যাচে ফিরছে ভারত, তখনই আবার অঘটন। অর্ধশতরান পূর্ণ করার একটু পরেই কামিন্সের বল কোহলির ব্যাটে লেগে বেল ফেলে দেয়। ৬৩ বলে ৫৪ রানেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়
বিরাটকে। কেএল রাহুল দায়িত্ব নিয়ে স্কোর টানছিলেন এরপরেও। কিন্তু তিনিও ১০৭ বলে ৬৬ রানের মাথায় স্টার্কের বলে উইকেট-রক্ষক ইংলিসের হাতে ক্যাচ তুলে দিয়ে বিদায় নেন। বাকিদের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। ৫০ ওভারে সব উইকেট খুইয়ে ভারতের স্কোর গিয়ে দাঁড়ায় মাত্র ২৪০!
এই বিশ্বকাপে প্রথমে ব্যাট করার ক্ষেত্রে এটি ভারতের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর। এর আগে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করে ২২৯ তুলে ছিল ভারত। কিন্তু সেবার মারকাটারি বোলিংয়ের সৌজন্যে ১০০ রানে জয় ছিনিয়ে নেওয়া গিয়েছিল। ফলে এবারও শামি-বুমরাদের উপর ভরসা রেখে শেষ হাসি হাসা যাবে বলে বিশ্বাস করেছিলেন অগণিত ভারত সমর্থক।
শুরুতে সেই ভরসা এদিন জুগিয়েও ছিলেন ২ ভারতীয় বোলার। ব্যক্তিগত মাত্র ৭ রানে শামির কাছে পরাস্ত হয়ে ফিরতে হয় ওয়ার্নারকে। বুমরাও অল্প রানে মার্শ ও স্মিথকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখান। কিন্তু ওই পর্যন্তই। শামি-বুমরার প্রাথমিক সাফল্যে জল ঢেলে লম্বা জমাট ব্যাটিং করে যান ট্রাভিস হেড। তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দেন মার্নাস। মজাচ্ছলে তখন মনে হচ্ছিল, ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের পথে হেডই হেডেক হয়ে দাঁড়ালেন। একটুও ভুল মনে হয়নি। একদিবসীয় ক্রিকেট বিশ্বকাপে ফাইনালের মতো সর্বোচ্চ গুরুত্বের ম্যাচে সেঞ্চুরি তো হাঁকালেনই, ১২০ বলে ৪টি ছক্কা ও ১৫টি বাউন্ডারিতে সাজানো ১৩৭ রানে মহম্মদ সিরাজের বলে শুভমানের হাতে ক্যাচ দিয়ে তিনি যখন মাঠ ছাড়লেন, গৌরবোজ্জ্বল জয় থেকে তখন ক্যাঙারু টিম মাত্র ২ রানের দূরত্বে। ৪৩ তম ওভারের পঞ্চম বলে আউট হন হেড। ওই ওভারেরই শেষ বলে জয়সূচক ২ রান নিয়ে খেলায় সোনালি দাঁড়ি টেনে দেন ক্রিজে নবাগত গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। মার্নাস অপরাজিত থেকে যান ব্যক্তিগত ৫৮ রানে। প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ—কে আর(!)—ট্রাভিস হেড।

ফাইনাল ৬ উইকেটে জিতলেও প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট সম্মান থেকে বিরাট কোহলিকে বঞ্চিত করা সম্ভব হয়নি অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে। তা যে এবার একেবারে অসম্ভব!

আইসিসি আয়োজিত পুরুষদের একদিবসীয় ক্রিকেট বিশ্বকাপ এবারের মতো শেষ হল এভাবেই। স্বনামাঙ্কিত স্টেডিয়ামে অজি অধিনায়কের হাতে কাপ তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সময় স্বভাব-তুখোড় নরেন্দ্র মোদীর শরীরী ভাষাও যেন-বা টাল খেল কোথাও! মুখে হাসি রইল ঠিকই, তবে তা চোখের বিষণ্ণতাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

ম্যাচ শেষের অব্যবহিত পরে নরেন্দ্র মোদী তাঁর এক্স (X, পূর্বনাম Twitter) হ্যান্ডলে অস্ট্রেলিয়াকে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি রোহিত-বিরাটদের উজ্জীবিত করেছেন তাঁদের অবদান ও প্রতিভাকে সম্মানজ্ঞাপনের মাধ্যমে। শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, সারা দেশই ১৯ নভেম্বরের রাতটাকে একটা বিক্ষিপ্ত অঘটন হিসেবে দেখছে। সামগ্রিক বিচারে ২৩-এর বিশ্বকাপ যে ভারতেরই বহুবিধ কালজয়ী কৃতিত্বে সমাকীর্ণ—সংয়য় কোথায়!
Image Courtesy: ICC
