মোদী অপ্রতিরোধ্য নয়

লেখক – বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

২০২৪ শেষ লোকসভা নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের আগেই হতে পারে বলে চর্চা শুরু হয়েছে । অর্থাৎ লোকসভা নির্বাচন এগিয়ে আনতে পারে নরেন্দ্র মোদী সরকার। মধ্য প্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়ে বিধান সভা নির্বাচনে ক্ষমতা দখল করেছে বিজেপি। বিজেপির নির্বাচনী ফলের হ্যাট্রিক নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে এখনও লেখালেখি চলছে। কিন্তু বিজেপির এই হ্যাট্রিক নিয়ে যে মাতামাতি চলছে তার নিচে চাপা পড়ে যাওয়া কঠিন অঙ্ক বলছে ২০২৪ শের ময়দানে বিজেপি বনাম বিরোধীদের জোরদার লড়াইয়ের সম্ভাবনা জেগে রয়েছে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়তো হয়না কিন্তু লক্ষন অনেক সময়ই ফিরে ফিরে আসে। যেমন,২০০৪ য়ের লোকসভা নির্বাচনের মুখে India Shining য়ের স্লোগানের ঢাক এত জোরে বেজেছিল যে মনে হয়েছিল বাজপেয়ী সরকারের ক্ষমতায় ফেরা শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু নির্বাচনের ফল কি হয়েছিল তার সবাই জানেন।


মধ্য প্রদেশ, এবং রাজস্থান ছত্তিশগড় বিধান সভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরা ডুবি হয়েছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। উত্তর ভারতের এই তিন রাজ্যে বিজেপির সাফল্যের আলো এতটাই উজ্জ্বল যে কর্ণাটকে কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরা অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। অনেকেই বলতে শুরু করেছেন এই হ্যট্রিক থেকেই পথ সোজা চলে গিয়েছে ২০২৪ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মসনদে বসার হ্যাট্রিকের দিকে। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের চুল চেরা বিশ্লেষণে গেলে যে অঙ্ক উঠে আসছে তাতে বিরোধীদের হতাশ হওয়ার জায়গা নেই। সঠিক জায়গায় চোখ ফেললেই বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যাবে ।


চলুন এবার কঠিন, শীতল অঙ্কের দুনিয়ায় প্রবেশ করা যাক। এই তিন রাজ্যের ভোট দানের হিসেব কষলে দেখা যাবে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল গুলির পক্ষে ভোট পড়েছে ১২.২৯কোটি। এরমধ্যে বিজেপি পেয়েছে ৪.৮২ কোটি ভোট। আর কংগ্রেস পেয়েছে ৪.৯২ কোটি ভোট। যদি বিরোধীদের India মঞ্চে থাকা অন্য দল গুলির ভোট যোগ করা হয় তা হলে এই সংখ্যাটা আরো বাড়বে। এর পাশাপাশি মধ্য প্রদেশে বিজেপির জয়ের মার্জিন বাদ দিলে অন্য দুই রাজ্যে কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে প্রাপ্ত ভোটের ফারাক অত্যন্ত কম। এছাড়াও মধ্য প্রদেশের পাশে তেলেঙ্গানা নির্বাচনে ফল হিসেব করলে দেখা যাবে সেখানে বিজেপির তুলনায় কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান অনেক বেশি। অতএব বলা যায় সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোট দেননি। মিজোরাম বাদে এই চার রাজ্যে ৮৩ টি লোকসভা আসন রয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে এর মধ্যে বিজেপি ৬৫ টি আসন পেয়েছিল। বাকি আসন গুলি কংগ্রেস সহ বিরোধীরা পেয়েছিল। যদি আগামী লোকসভা নির্বাচনে এই চার রাজ্যে মানুষ বিজেপির পক্ষে যে ভোট দিয়েছেন তাই যদি দেন তাহলে বিরোধীদের ই লাভ হবে। একটু অঙ্ক কষলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ২০১৯শে মধ্য প্রদেশে বিজেপি পেয়েছিল ২৮ টি আসন। আর কংগ্রেস পেয়েছিল একটি আসন। সাম্প্রতিক নির্বাচনের নিরিখে হিসেবটা বলছে বিজেপি পাবে ২৪ টি আসন আর কংগ্রেস পাবে ৫টি আসন। একই হিসেবে লোকসভা আসন গুলি ধরে বিচার করলে দেখা যাচ্ছে ২০১৯শে ছত্তিশগড়ে বিজেপি পেয়েছিল ৯টি আসন, কংগ্রেস পেয়েছিল ২টি আসন। এবারের ফলের নিরিখে বিজেপি পাবে ৮ টি আসন, কংগ্রেস পাবে ৩টি আসন। আর লোকসভা আসন ধরে রাজস্থান বিধান সভা নির্বাচনের ফল হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে বিজেপি পাবে ১৪ টি আসন, আর কংগ্রেস পাবে ১১টি আসন।২০১৯শে বিজেপি রাজস্থানে পেয়েছিল ২৪ টি আসন। এবার যদি তেলেঙ্গানার দিকে তাকানো যায় তাহলে হিসেব বলছে কংগ্রেস পাবে ৯টি আসন, আর বিজেপিকে ফিরতে হবে শুন্য হাতে। ২০১৯শে এই রাজ্যে বিজেপি ৪টি আসন পেয়েছিল। অতএব চার রাজ্যের এই হিসেব থেকে দেখা যাচ্ছে বিজেপি পেতে পারে ৪৬টি আসন। অর্থাৎ ২০১৯শের তুলনায় ১৯টি আসন কম। আর কংগ্রেস পেতে পারে ২৮ টি আসন অর্থাৎ ২০১৯শের তুলনায় ২২টি বেশি আসন। এক ই সঙ্গে এই অঙ্কের ফল দেখাচ্ছে কংগ্রেস যদি বড় দলের অহংকার ছেড়ে India মঞ্চে অন্য দলগুলির সঙ্গে ইতিবাচক বোঝা পড়ায় যায় তাহলে বিজেপির বিপদ বাড়বে। অর্থাৎ এই চার রাজ্যের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কংগ্রেস যে কৌশল নিয়ে চলেছে তার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে কংগ্রেসকে।


এই অঙ্ক বোঝার মতো লোক বিজেপিতে নেই ভাবলে বিরাট ভুল হবে। এই অঙ্ক বুঝেই বিজেপি অযোধ্যার রামমন্দির নির্মাণ কে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। ২০২৪ শের ২২শে জানুয়ারি অযোধ্যার মন্দিরে বিগ্ৰহের প্রান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রামলালা বিরাজমান হবেন। নির্বাচনী অঙ্ক কষেই এই মন্দিরের নির্মান থেকে উদ্বোধন পর্যন্ত সমগ্ৰ কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। আগামী লোকসভার ভোট যুদ্ধে অযোধ্যার রামমন্দির যে বিজেপির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি বলবে ওইখানেই রামমন্দির বানাবো বলেছিলাম, আমরা বানিয়ে দিলাম। এবার আপনারা আমাদের ভোট দিয়ে জয়ী করুন। সাম্প্রতিক রাজ্য বিধানসভা ভোটের প্রচারে এই অস্ত্রটিকে ব্যাবহারও করেছে বিজেপি। আগামী লোকসভা নির্বাচনে এই কৌশল ব্যবহারে চেষ্টার ত্রুটি রাখবেনা বিজেপি। কারণ ভক্তি রসের ঢেউ তুলতে পারলে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে ব্যর্থতার বিষয় গুলি ভেসে যাবে। এর পাশাপাশি জাতপাত, দলিত নিপীড়ন ও জনজাতি মানুষের বঞ্চনার মতো বিষয়গুলোকে “অখন্ড হিন্দুত্ব” দিয়ে আড়াল করা যাবে। অতএব বিরোধী দল গুলিকে এক ছাতার তলায় এসে পারস্পরিক ইতিবাচক বোঝা পড়ার মধ্যে দিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে নামতে হবে। সময় কিন্তু খুবই কম।