নেতা থেকে বিচারক – অপরাধে আপোস নয়…
‘যৌন নিগ্রহ ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় কাজ করছে না। এমনকি ওই ধরনের অপরাধীদের সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদেরও দেখা মিলছে। দেশের মহিলা কুস্তিগীরদের সঙ্গে যৌন নিগ্রহের মামলায় কী ঘটল? এত গুরুতর অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে, রেসলিং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার (Wrestling Federation of India) সেই বিদায়ী প্রধান, ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং (Brij Bhushan Sharan Singh) দিব্যি স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!’
আজ ১৬ ডিসেম্বর ২০২৩। ১১ বছর আগে এই দিনেই ঘটেছিল ‘নির্ভয়াকাণ্ড’! চরম বর্বরতার অন্ধকার চিহ্নিত এই তারিখেই চাঁছাছোলা ভাষায় মুখ খুললেন দিল্লি মহিলা কমিশনের (Delhi Commission for Women) চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়াল (Swati Maliwal)। সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘নির্ভয়াকাণ্ডের সময় দুর্বিষহ পরিস্থিতির বদল আনতে বহু মানুষ পথে নেমেছিলেন। কিন্তু সেই মর্মান্তিক ঘটনার এত বছর পরেও আমরা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। দিনে দিনে নারী নির্যাতন বেড়েই চলেছে। কিছুই পাল্টাবে না, যতক্ষণ না অপরাধীরা এই ভেবে অনুকম্পিত হয় যে, অমন ঘৃণ্য অপরাধের জন্য শাসন ও বিচার ব্যবস্থা তাদের বিন্দুমাত্র রেয়াত করবে না।’ স্বাতী মালিওয়ালের স্পষ্ট নিদান, ‘সরকারের পক্ষে একান্ত জরুরি হল, নারী নিগ্রহ ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে যথাযথ গুরুত্ব সহকারে নেওয়া। দরকার সুনিশ্চিত ও সত্বর শাস্তিবিধানের ব্যবস্থা। দেশে পুলিশ বাহিনীর (Police Strength) পাশাপাশি ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট (Fast Track Court)-এর সংখ্যাও বাড়ানো উচিত।’

Image Courtesy: Delhi Commission For Women – DCW
দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন স্বাতী মালিওয়ালের মতামত তিক্ত লাগলেও মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (National Crime Records Bureau – NCRB)-র রিপোর্ট তাঁর বক্তব্যকে পুরোপুরি সমর্থন করছে।
২০২২-এ দেশের রাজধানীতে নারীর সঙ্গে ঘটা অপরাধের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১৪ হাজার ছাপিয়ে গিয়েছে! ওই ১ বছরে ১ হাজারের বেশি ধর্ষণের অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে!

এলাকার পরিসর সামান্য বাড়ালে, উত্তরপ্রদেশে নির্ভয়াকাণ্ডের প্রায় অনুকৃতি ঘটে গিয়েছে চলতি মাসে, ঠিক ৭ দিন আগে। সেই একই রকম ‘বাসের ভিতর গণধর্ষণ!’ এক্ষেত্রে নির্যাতিতা প্রাণে বেঁচেছেন, এই যা!

অর্থাৎ, স্বাতী মালিওয়াল যা বলছেন, তার মধ্যে অতিরঞ্জন নেই। এত বছরে পুরুষতান্ত্রিক ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় একটুও উত্তরণ বাস্তবায়িত হয়নি। হয়েছে কি? হলে, খোদ বিচারকদের মধ্যেই লিঙ্গভেদে এত বৈষম্য কেন? কেন আজও ভারতের এক বিচারক মহিলা হওয়ার ‘খেসারত’ দিচ্ছেন আরেক বিচারকের (পুরুষ) যৌন লালসার আগুনে পুড়ে যেতে যেতে? সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে লেখা ইউপির সিভিল কোর্টের মহিলা জাজের চিঠির সকরুণ বিষয়বস্তু সামনে এসেছে তো আমাদের, সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে! তারপর আর কীই-বা বলার থাকে!

তবু বলতে হয়। স্বাতীর অনুসরণে এ কথা বলতেই হয় – সরকার, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার তৎপরতা সহ কঠোরতা নিশ্চয়ই নারী-লাঞ্ছনা দমনে উল্লেখযোগ্য দাওয়াই। তবে তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ মহৌষধটি লুকিয়ে আছে শিক্ষাব্যবস্থায়। পুরুষ শিক্ষার্থীর মধ্যে নারীর প্রতি সম্ভ্রমের মূল্যবোধকে জাগিয়ে তোলা এখন আশুকর্তব্য। প্রক্রিয়াটি মন্থর, কিন্তু স্থায়ী ফল প্রদায়ী। দিল্লি মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন সেই প্রস্তাবও রেখেছেন।
আসলে নারী অবমাননা রুখতে হলে, তাৎক্ষণিক ও সুদূরপ্রসারী – সব রকম পথেই ঘিরে ধরতে হবে অপরাধীদের। এবং হ্যাঁ, অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ানো রাজনৈতিক দল ও তার নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ছুড়ে ফেলতে হবে অবিলম্বে। ‘নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।’
