২৪-এর লোকসভা নির্বাচন আসন্ন। এনডিএ তথা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গঠিত হয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির জোট ‘ইন্ডিয়া’। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এ কোনও নতুন খবর নয়।
রাজনৈতিক ঘটনা পরস্পরা থেকে ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সদর্থক ভূমিকা। এই পরিস্থিতিতে প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে আকচাআকচির জেরে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে একাই লড়বে তৃণমূল কংগ্রেস। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তৃণমূলের অবস্থান সম্পর্কে লোকসভা নির্বাচনের পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সাফ জানিয়েছেন মমতা।
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ ধরনের কঠোর অবস্থানের পরে কাঠগড়ায় প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্রদেশ কংগ্রেস। বেশ কিছুদিন ধরে প্রদেশ কংগ্রেস দাবি করছে, ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ১০টি কেন্দ্র যেন কংগ্রেসকে ছেড়ে দেয় তৃণমূল কংগ্রেস।
এদিকে এই দাবি মানতে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল জানিয়েছে, তৃণমূল সর্বসাকুল্যে দুটি কেন্দ্র কংগ্রেসকে ছাড়তে রাজি। এই দুটি লোকসভা কেন্দ্র হল বহরমপুর ও দক্ষিণ মালদা।
২০১৯ সালে এই দুই লোকসভা কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন প্রদেশ কংগ্রেসের বর্তমান সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা আবু হাসেম খান চৌধুরী (ডালু)। অশীতিপর আবু হাসেম খান চৌধুরী ইতিমধ্যে দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের পরোয়া না করেই দক্ষিণ মালদা কেন্দ্র থেকে ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ফের প্রার্থী হওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার অসম থেকে ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’ পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’ ঘিরে প্রদেশ কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন করে তিক্ততা তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধির নেতৃত্বে গত ২৫ জানুয়ারি ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’ অসম থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করবে, এব্যাপারে আগেভাগে রাজ্যের শাসকদলকে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব কিছুই জানায়নি।
উল্টে শিলিগুড়িতে রাহুল গান্ধি সভা করার পুলিশি অনুমতি না পাওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত রাজ্য সরকারকে কটাক্ষ করে ফের হাওয়া গরম করেছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীররঞ্জন চৌধুরী। তিনি দাবি করেছেন, বিজেপিশাসিত মণিপুর ও অসমে রাহুলের ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’কে যেভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে, একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হল পশ্চিমবঙ্গেও।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতামত, অধীররঞ্জন এই মন্তব্য করে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসকে একই পঙক্তিতে ফেলেছেন। যা নিয়ে জোর বিতর্ক শুরু হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলাতে এরপর কংগ্রেস-তৃণমূল কংগ্রেসের ভিতর তিক্ততার অবসানে ড্যামেজ কন্ট্রোলের মরিয়া প্রয়াসে আসরে নামতে হয়েছে খোদ কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গেকে। বৃহস্পতিবারই খাড়্গে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফোন করেন। দু’জনের মধ্যে কিছুক্ষণ কথাবার্তা হয়।
খাড়্গের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তা নিয়ে যে জল্পনা শুরু হয়, এর অবসান ঘটাতে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ সাংবাদিকদের কাছে মুখ খোলেন।
সংবাদমাধ্যমকে জয়রাম রমেশ জানান, ২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে কোনওভাবে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে শক্তিশালী করা সম্ভবপর নয়। একারণেই কংগ্রেস সভাপতি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিজেপি তথা এনডিএ-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই।
তবে এর আগেও একাধিকবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার প্রয়াস চালিয়েছেন খাড়্গে। খাড়্গে কখনও চিঠি পাঠিয়ে অথবা ই-মেল মারফত যোগাযোগ করলেও প্রধানত প্রদেশ কংগ্রেসের নেতিবাচক ভূমিকায় বিরক্ত মমতা উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে নীরব থেকেছেন বলে অভিমত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এখন অপেক্ষায়, খাড়্গের সঙ্গে ফোনালাপের পর কী অব্স্থান নেবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্তর্গত ২৬টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন। উত্তরপ্রদেশের অখিলেশ যাদব, ঝাড়খণ্ডের হেমন্ত সোরেন, মহারাষ্ট্রের উদ্ধব ঠাকরে, বিহারের তেজস্বী যাদব থেকে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের মতো নেতাদের পাশাপাশি কংগ্রেস হাইকমান্ডের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াকু ভাবমূর্তি নতুন করে গুরুত্ব আদায় করল, বলার অপেক্ষা রাখে না একথাও। আর সব শেষে নীতিশ কুমার পাল্টি খাওয়ার পরে বিজেপি বিরোধী প্রধান মুখ হয়ে উঠলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বিজেপি বিরোধী লড়াইয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
