মৃত্যুর পরেও বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকের নিথর দেহের হেনস্থার শেষ নেই। বাংলাদেশি সন্দেহে ভগবানগোলার সামিরুলের দেহ তিন দিন আটকে রাখল লাশকাটা ঘরে।বাংলার পরিযায়ী ঐক্য মঞ্চের সদস্যরা উদ্যোগ না নিলে ছেলের লাশ ও পেতেন না তাঁর বাবা মা।

মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলার বাসিন্দা যুবক সামিরুল শেখ তামিলনাড়ুতে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে গিয়েছিলেন।সেখানে তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। খবর আসে ভগবানগোলায় সামিরুলের বাবা মায়ের কাছে। সন্তান হারিয়ে বাবা মা যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।সন্তানের লাশ বাড়িতে আনার চেষ্ঠা শুরু হয়েছে। তখন চেন্নাইয়ের কোরাততুর পুলিশ স্টেশন থেকে জানানো হয় ছেলের দেহের ময়নাতদন্ত হয়ে লাশকাটা ঘরে রয়েছে।

ছেলের লাশ বাড়িতে নিয়ে যেতে হলে বাবা মা দুজনকেই চেন্নাইয়ে আসতে হবে।দিনমজুর পরিবার বুঝে উঠতে পারছিলেন না অন্যকেউ নয় কেন বাবা মাকেই যেতে হবে।এই সমস্যার কথা পৌঁচ্ছে যায় পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী ঐক্য মঞ্চের মুর্শিদাবাদের জেলা সম্পাদক সরাফ আবেদিনের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে গোটা টিম।

জেলা সভাপতি আসিফ ফারুক চেন্নাইয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ চালিয়ে যান।কিন্তু অনড় পুলিশ বাবা মাকে ফিজিক্যালি আসতেই হবে।পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী ঐক্য মঞ্চের অন্যতম কান্ডারি সেখ রিপন যোগাযোগ করেন কেরালার পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেন এমন দুই সমাজকর্মী দিশা দেবাদাস ও আইয়াজ আনোয়ারের সঙ্গে। তারা সমানে চেষ্ঠা চালিয়ে যেতে থাকেন। একই ভাবে সেখ রিপনের নেতৃত্বে পরিযায়ী ঐক্যমঞ্চের সদস্যরা লাগাতার চেষ্ঠা জারি রাখে। কিন্তু পুলিশ কোন কথাতেই গুরুত্ব দিচ্ছিল না। তখনই জানা গেল মুসলিম হওয়ার কারণে মৃত সামিরুল শেখকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী সন্দেহ করা হচ্ছে। তাই তার বাবা মাকে সশরীরে হাজির থাকার জন্য বলা হচ্ছে।

সাধারণত লোকাল থানা বাড়িতে ভেরিফাই করে নো অবজেকশন সাটিফিকেট দিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় মেল করলে সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। কোরাত্তুর থানা যেহেতু ভগবানগোলার থানাতে ছেলেটির মৃতদেহ নিশ্চিত করে ইমেইল পাঠায়নি সুতরাং ভগবানগোলা থানা NOC দিতে পারছিল না। তারপর ভগবোনাগোলার বিডিও নাজির হোসেনকে বিষয়টি জানানোর পর তিনি খোঁজখবর করে নো অবজেকশন সাটিফিকেটের ব্যবস্থা করেন।
আরো কয়েকটি জায়গায় কথা বলার পর চেন্নাইয়ের কোরাত্তুর থানা মৃতদেহটির পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করে। অবশেষে সামিরুল শেখের মৃতদেহ মুর্শিদাবাদের গ্রামের বাড়িতে আনা হয়।পরিযায়ী ঐক্যমঞ্চের সদস্যরা পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে।

ভাবুন একবার বাংলার মুসলিম মানেই বাংলাদেশী এই সরলীকরণ করা চেষ্ঠা দেশ জুড়ে চলছে। কিছুদিন আগে ওড়িষ্যা থেকে বাংলা থেকে উড়িষ্যায় কাজ করতে যাওয়া মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের বাংলাদেশী দাগিয়ে গিয়ে তাদের মারধর করে উড়িষ্যা ছাড়া করা হয়ছিল। এসব ঘটনা কতটা গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে তা আর একবার প্রমাণিত হল সামিরুল শেখের মৃত্যু দেহ আটকে রাখার মাধ্যমে। এক গভীর অসুখের জন্ম নিচ্ছে। এই ব্যাধি থেকে মুক্তি মিলবে না আর ও বাড়বে তা নির্ভর করবে ক্ষমতায় যে যেখানে রয়েছে মুসলমান সম্পর্কে তাঁদের স্বচ্ছ ধরণার ওপর। এটা রুখতে না পারলে আগামী দিন এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। এত কিছুর মধ্যেও পরিযায়ী ঐক্য মঞ্চের সদস্যদের ধন্যবাদ জানাতেই হবে। কারণ তারা উদ্যোগ না নিলে সামিরল শেখের দেহ হয়ত এখনো লাশকাটা ঘরে পড়ে থাকত।
