লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
রাজকন্যা কম পড়িয়াছে? হাল্লার রাজা প্রশ্ন করেছিলেন শুন্ডির রাজাকে। সংবিধান প্রণয়নের ৭৫ বছর পরে প্রজাতন্ত্র দিবসে রাজার কাছে প্রজার প্রশ্ন উৎসাহ কি কম পড়িয়াছে? খেলা থেকে ধর্ম সব বিষয়ে উদ্বেল হয়ে ওঠা যে দেশে দস্তুর, সে দেশে প্রজাতন্ত্র দিবসে এমন শিথিল আবেগ কিছুটা বিস্ময় জাগায়। এবার ২৬ শে জানুয়ারি সরকারি মহল থেকে রাজনৈতিক সামাজিক পরিসরে সংবিধান বা সাধারণতন্ত্র নিয়ে শোরগোলের অভাব ছিল অপরিচিত দৃশ্য। অথচ সংবিধানের ৭৫ বছর পূর্তির কারণে অতিরিক্ত উৎসাহের মঞ্চ প্রস্তুত ছিল। কিন্তু, সেই উপলক্ষে বিপননের প্রসার ঘটানোর সুযোগের সদ্ব্যবহারে বানিজ্যিক সংস্থা গুলির বিজ্ঞাপনের বহরের তুলনায় রাজা অথবা প্রজার উদ্দীপনা বড়ই ম্লান দেখিয়েছে। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনে শাসক বিরোধী প্রচার তর্জায় অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল সংবিধান। তারও পাঁচ বছর আগে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নাগরিক সমাজের প্রধান হাতিয়ার ছিল সংবিধানের প্রস্তাবনায় লিখিত,”we the people of India” বাক্যবন্ধটি। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সভায়, সংসদ কক্ষে বিরোধী দলগুলির নেতাদের হাতে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে সংবিধান গ্ৰন্থ অতি পরিচিত দৃশ্য। পাশাপাশি, বর্তমান শাসকের হাতে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ্যভাবে সংবিধানের উদার গণতান্ত্রিক চরিত্র বিপন্ন এই অভিযোগে ক্ষোভ বিক্ষোভ ও কম নয়।

কিছু দিন আগেই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর মন্তব্যে সংবিধান প্রণেতা আম্বেদকরের অপমান হয়েছে এই অভিযোগে সংসদের ভিতরে বাইরে তুমুল তরজা দেশবাসী দেখেছে। যদিও এই সব অভিযোগই অস্বীকার করেছে শাসক দল। এই তো সেদিন নবনির্মিত সংসদ ভবনে প্রবেশ করে সংবিধান কে প্রধানমন্ত্রীর সাড়ম্বরে প্রণামের দৃশ্য তো দেশের সব কোনায় ছড়িয়ে পড়েছিল। এই প্রবহমান ঘটনা থেকে পরিষ্কার যে এখন দেশের রাজনীতি তে বিরোধ ও আন্দোলনের একটি প্রধান হাতিয়ার ১৯৫০ সালে গৃহীত সংবিধান। তবে, সরকার পক্ষ থেকে গতানুগতিক ভাবে হলেও রাষ্ট্রীয় কুচকাওয়াজ, সমরসজ্জা, শোভা যাত্রা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ঘোষণায় কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু, বিরোধী পরিসর?

সদ্য বিগত প্রজাতন্ত্র দিবসে তাদের ভূমিকায় সংবিধানের আদর্শ তুলে ধরার চেষ্টা তেমন ভাবে দেখা গেল কি? ভারতীয় সংবিধানের গোড়াতেই বলা হয়েছে এই সংবিধান রচনা করেছে. “we , the people” অর্থাৎ ভারতের জনগনেশ। গণতন্ত্রের বীজতলায় এই যে মন্ত্র সযত্নে রাখা রয়েছে তার প্রতি কি শাসক, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলই শ্রদ্ধাশীল? জন প্রতিনিধিত্ব মূলক এই বীজমন্ত্র কে ব্যবহার করে সব দল ই যে রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখতে চায় তা দেখতেই তো আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। এই সর্বদলীয় প্রবণতার কারণেই কী সব পরিসরে উৎসাহের অভাব? অস্বস্তিকর প্রশ্নের উত্তর না পাওয়াটা ও তো আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
