বাঙালি পালাচ্ছে! পালাচ্ছে বাঙালি!

Bangali situation

লেখক সৌভিক মজুমদার

সত্তরের দশক পর্যন্ত ক্যালকাটার একটা চার্ম ছিল, একটা স্পিরিট ছিল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিমছাম একটা শহর, জনঘনত্ব কম। অভাব অভিযোগ ছিল বৈকি! অনেক ছিল! তালিকায় – দেশভাগের ঘা শুকিয়ে উগ্র বাম রাজনীতি, নকশালনিধনের নামে এক মেধাবী তরুণ প্রজন্মকে উপড়ে ফেলা, খানাখন্দের ভালো মন্দে শহুরে জীবন, ভিড়ে উপচানো বাস, আটঘন্টার লোডশেডিং, দুষ্প্রাপ্য বেবিফুড, রেশনে চাল চিনির আকাল, হুগলি নদীর পাড় ধরে শিল্পায়নের গৌরবে বিহারি কলোনি, বড়বাজারীয় ভেজাল সংস্কৃতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও শহুরে মাস্তানদের রমরমা, জয় বাংলার উপদ্রব – চোখের অসুখ হোক বা শরণার্থী! তবু মানুষের মধ্যে কিছু করে দেখানোর তাগিদ, সংস্কৃতি মনস্কতা প্রবলভাবে ছিল।

কলেজ স্ট্রিটে সারা বছর বই কিনত বাঙালিরা। ইংল্যাণ্ড -আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে তাক্ লাগানো মেধাবী বাঙালি ছাত্রের ঝকঝকে মার্কশিট; প্রেসিডেন্সির অলিন্দে বাঙালি মেধার প্রতিধ্বনি। কফি হাউস গমগম করত কত তরুণ তুর্কি আর বরেণ্য মানুষের আনাগোনায়, কফির কাপে কবিতা-কাহিনীকল্পনা, রাজনীতি আর সমাজনীতির আতুঁড়। শম্ভু-তৃপ্তি, অজিতেশ-কেয়ার দৃপ্ত পদচারণেথিয়েটার পাড়া জুড়ে ব্যস্ততা আর উপচে পড়া নাটকমোদী বাঙালি ভিড়। বিখ্যাত সব নাটক আর বোদ্ধা দর্শক। বাঙালির সিনেমার লেন্সে তখন আন্তর্জাতিক ফোকাস! সত্যজিৎ- ঋত্বিক- মৃণালের পাশাপাশি তপন- তরুণ- অসিত- অজয়। বোর্ড-থিয়েটার আর সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হলগুলো ছিল বঙ্গ দম্পতিদের একমাত্র এনটারটেনমেন্টের জায়গা। তাই রূপবাণী, অরুণা, বিজলি। প্রাচী, ভারতী থেকে প্রিয়া, মিত্রা, দর্পণা সব হাউসফুল হত। থাকতো স্টার-রঙ্গনা-বিশ্বরূপা- রঙমহলের সুপারহিট নাটক সেখানে রঞ্জিৎমল কাঙ্কারিয়াকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতেন রাসবিহারী সরকার।

ধর্মতলা অঞ্চলের গ্লোব, এলিট, নিউ এম্পায়ার, মেট্রো ছিল প্রধানত বিদেশী ছায়াছবির জন্য বিখ্যাত, নাইট শোয়ে যেখানে উঁকি দিতেন উত্তম-সৌমিত্র- অপর্ণা সেন থেকে সত্যজিৎ রায়। বড়ে গোলাম- আমীর খাঁ সাহেবের তানকারি, গ্বালিবের কথকতা – হুসেনের বোহেমিয়ানা, বড়ুয়া- সায়গলের যুগলবন্দী, রুশি মোদির কলকাতা প্রেম, প্যাম ক্রেনের জ্যাজ জাদু, থাঙ্কমণি কুট্টির নিক্কণ, ড. আদি গজদারের পিয়ানোর সুর রমাপ্রসাদ গোয়েঙ্কার রবীন্দ্রচর্চা, কুট্টির কার্টুন বা শ্যামানন্দ জালানের নাটকচর্চা ছিল এ শহরেরই জলের গুণ।

কিন্তু  হায়! আজ দেবী সরস্বতী বন্দিনী কুবেরের শৃঙ্খলে। তাই কি বাঙালি পালাচ্ছে? পালাচ্ছে বেঙ্গালুরু বা বার্মিংহ্যাম, পুনে কিম্বা ক্যালিফোর্নিয়া! বন্দিনী সরস্বতীর প্রভাব আজ সর্বত্র। রুচি পছন্দ থেকে শুরু  করে সংস্কৃতির রাজনীতি আর রাজনীতির সংস্কৃতি সবই নিয়ন্ত্রণকারী ধনাঢ্য বেওসায়িমহল। সতর্ক করেছিলেন স্বয়ং পরশুরাম, লিখেছিলেন – শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড! আমরাই আমল দিইনি। সেই বেওসায়িরাই আজ রাজার আসনে, যাদের ইচ্ছেকে কুর্নিশ করে ভেঙে ফেলতে হয় পোস্তা উড়ালপুল, মুছে যায় বাংলা সাইনবোর্ড, চাঁদির জুতোয় হাতছাড়া হয় আলিপুর- ভবানীপুর- ম্যান্ডেভিল থেকে হালফিলের সল্ট লেক। কলোনিয়াল সংস্কৃতির বাহক সাহেবসুবোদের ক্লাবে মেড়ো সংস্কৃতির নির্লজ্জ প্রদর্শন আর কলকাতায় আহরিত সম্পদের অশিক্ষিত উল্লাস। মরুধর মেলা সাজিয়ে এই শহরের বুকে নিজেদের বিত্তের আস্ফালন! ডিজে নাইট- পাঞ্জাবি- ভোজপুরী অশ্লীল গানে রক্তাক্ত হয় বড়ে গোলাম- রবিশঙ্কর আলি আকবর আর হেমন্ত-মান্না শোনা বাঙালির কান। বীরেন ভদ্র’র বেতার বদলে যায় রেডিওজকির হিন্দি টানের ভাঙা বাংলায়। আকাশবাণীকে জিভ ভ্যাঙচায় মির্চি আর তার বলিউডি ‘মশালা’! বাঙালি পালাচ্ছে কলকাতা ছেড়ে।

বাঙালি পালাচ্ছে কলকাতার কবোষ্ণ কোল ছেড়ে বারুইপুর টু বারাসাত, বারাসাত টু বেঙ্গালুরু, বেঙ্গালুরু টু বোস্টন।এই বাঙালির কলমই একদা লিখেছিল – জেনো বাসনার সেরা রসনায়। উত্তর আধুনিকফুড মাফিয়াদের নিত্যনতুন বিরিয়ানি দোকানে কুমাংস-শোভিত কৃত্রিম রঙীন ভাতখেকো এই প্রজন্ম কি আন্দাজ পাবে সেই সুললিত স্বাদ-গন্ধ? পার্ক স্ট্রিটের কন্টিনেন্টাল সুখাদ্য আর চিনা রসুইয়ের নিজহাতে বানানো জিভে জল আনা চিনে খাবার। সাবিরের রেজালা মিথ আর রয়্যাল চাঁবের রহস্য, অনাদির মোগলাই, গোলবাড়ির কষা মাংস, চাচার ফাউল কাটলেট, আপনজনের ফ্রাই আর রাধুবাবুর চপের ভেল্কি!সেইসঙ্গে একদম খাঁটি বাঙালি মিষ্টির পাড়ার দোকানের কচুরি, সিঙ্গাড়া এবং মিষ্টি, যে তালিকায় নকুড়, দ্বারিক, ভীম নাগের পাশাপাশি জ্বলজ্বল করত গাঙ্গুরাম- বাঞ্ছারাম ও। অ্যালেন-মিত্র-নিরঞ্জনের ঐশ্বরিক স্বাদ আর কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় বিকেলের তেলেভাজা ছিল বাঙালির জিভের বিলাসিতা।

তখন কিছু মাড়োয়ারি শ্রেষ্ঠী গাদাগাদি বড়বাজারে, ভবানীপুর আর ডানলপে কিছু পাঞ্জাবী ড্রাইভার ও ট্রাক ব্যবসায়ী আর বিহারের মুটে মজুর, ধাঙড়, রিক্সাওয়ালা ছাড়া খুব বেশী অবাঙালিদের আগমন ঘটেনি এ বঙ্গদর্পণে তাই শরৎশশীরা মুখর ছিলেন জীবনচর্যায়; তাদের জীবনে অযাচিত উত্তর ভারতীয়সংস্কৃতি তো অনপনেয়! তাই তখন সিঙ্গারা কচুরিতে কসৌরি মেথি নামক দ্রব্যটি বিষাক্ত করেনি তার স্বাদ, সিঙ্গাড়া হয়ে ওঠেনি ‘সামোসা’। ইতি উতি বিভিন্ন ভুজিয়াওয়ালাদের বেসনের কুখাদ্যের বেসাতি গজিয়ে ওঠেনি। বিশুদ্ধ শাকাহারী ভোজনালয়ের নামে মেড়ো-গুজ্জু অখাদ্যের বিপণন শুরু হয়নি!

কলকাতার বিখ্যাত মাছবাজারগুলো আজ তো রীতিমত অস্তিত্বের সংকটে কারণ সন্তর্পণে ঘটে যাওয়া বাঙালির খাবার রুচিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে উত্তর ভারতীয়- মাড়োয়ারি ঘিয়েভাজা নিরামিষ খাদ্যসংস্কৃতি! আজ অনেক বহুতলে সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে আমিষাহারীদের জন্য এই বহুতল নিষিদ্ধ! ভাবা যায়?

তারপর ক্রমশ হাওড়া ব্রিজ থেকে মেট্রো স্টেশন গুটকার রঙে যত রঙ্গিন হয়েছে ততই হারিয়েছে বাঙালির আইডেন্টিটি, আর ক্রমে সঙ্কটাপন্ন হয়েছে বাঙালি মনীষা আর হাওড়া ব্রিজের ভিত। ততই কুৎসিত হয়েছে ‘কলকাত্তা’!! ফুলকো লুচি বা রাধাবল্লভীর বদলে বিয়ের মেনুতে কুলচা, নান, মিশরি রোটি জায়গা দখল করেছে। আর বাবুসন্দেশ- রসগোল্লার বদলে যে সব বাঙালি বাড়িতে জিলিপি-রাবড়ি খাওয়ায় তাদের তো ডিএনএ পরীক্ষা করা উচিত। প্রশাসনেও তথৈবচ! বঙ্গের মুখ্য সচিব এখন ঠোক্কর খাওয়া বাংলায় কথা বলেন!বাঙালি পুলিশ কমিশনার তো দূরবীন দিয়ে খুঁজতে হয়। প্রশ্ন জাগে হঠাৎ কি করে সম্ভব উত্তরপ্রদেশী- বিহারি ছেলেদের আইএএসে এইরকম অস্বাভাবিক সাফল্য আর মেধা প্রদর্শন?

বাংলার প্রশাসনে এদের আধিপত্য ধীরে অথচ  নিশ্চিতভাবে প্রভাব ফেলছে জনজীবনে, সংস্কৃতিতে। প্রশাসনে বিহারি মেধার রমরমা মনে করায় এটা কি খানিকটা সকল মাড়োয়ারি সুপুত্রদের ফেলটুস রেজাল্ট ব্যতিরেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট হবার গল্পের মত নয়?খেলাধুলোর জগতেও এসেছে পরিবর্তন। বাঙালি স্পোর্টসম্যান এখন সোনার পাথরবাটি! বাঙালি এখন ফুটবল খেলে না। এ শহর দেখেছে সামাদের ড্রিবল্ থেকে শৈলেনের ট্যাকল। চুনী-পিকে’র পাশাপাশি সাহু মেওয়ালালকে, সুরজিত-সুব্রতর পাশাপাশি চিমাকে, মজিদ-জামশিদের পাশাপাশি জেভিয়ার পায়াসকে।

তিরাশির ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের পর ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান মহামেডানের তেজ কমেছে, ক্রেজ বেড়েছে ক্রিকেটের। মাতামাতি শুরু হয়েছিল ঠিকই তবে আইপিএল উল্লাসে বাঙালির সাধের ইডেন গ্যালারিও এখন অবাঙালিদের দখলে। আইপিএলে এখন সত্তর শতাংশ মেহেন্দিওয়ালারা যায়, একটাও বাংলা গান বাজে না ডিজের কুৎসিত প্লে লিস্টে। ব্যাট হাতে বাঙালি অরুনলাল আজও নিঃসংশয়ে ব্যতিক্রম। কল্লোলিনী কলকাতা হতে চেয়েছিল কসমোপলিটন বিফ শাতোঁ ব্রিয়া, পর্ক বেলি রোস্ট, শামি কাবাব আর ইলিশ পাতুরিতে। পেতে চেয়েছিল আন্তর্জাতিক এক নগর গরিমা রবীন্দ্রনাথ- বিবেকানন্দ, রবিশঙ্কর- আলি আকবর, সত্যজিৎ- মুজতবা আলি, জন লেনন-ববি ডিলানে, সুফিতে – লালন সাঁইয়ে।এরকম কুৎসিত মাড়োয়ারিকরন কদাচ দেখতে চায়নি!তাতে কি!! বেহায়া আমরা বিয়েতে মেহেন্দি পরছি, সংগীত মানাচ্ছি, ধাক্কা পাড়ের ধুতি গলাধাক্কা খেয়েছে শেরোয়ানির কাছে! বেনারসি লজ্জায় মুখ লুকিয়েছে লেহেঙ্গার অসভ্যতায়! ধনতেরাস, লোরি, শ্রাবণ মাসে সবুজ কাচের চুড়ি, ছটের ধুন্ধুমার, নওরাত্রির নিরামিষ, দিওয়ালি ধামাকা… এগুলোই আমাদের ভবিতব্য।হ্যাঁ! সবাইকে নকল করে আমরা একটা কিম্ভুত প্রজাতি হব…! হবই হব…!ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর!আর ঠিক তারপর এলো লকডাউন!

গৃহবন্দী বিশ্ব। গৃহবন্দী বাঙালি। এই তো সুযোগ পিছন ফিরে তাকানোর। কি হারিয়েছি আর কি হারাচ্ছি তার হিসেব নিকেশ করার! কড়ায় গণ্ডায়! ভাবার শুরু তখন থেকেই! পালাতে পালাতে ক্লান্ত বাঙালি নিজভূমে পরবাসী হবার আগে কি ঘুরে দাঁড়াবে না? ভাববে না নতুন করে? চোখের পলকে কেটে গেছে সিকি শতাব্দী, এখন বাকি শতাব্দীর লেখার পালা বাকি ইতিহাস…