Kurmi Movement
কুড়মি নেতা অজিত মাহাতোর নেতৃত্বে ফের লাগাতার কুড়মি নেতারা জঙ্গলমহল জুড়ে বড়সড় আন্দলন সংগঠিত করার জন্য কোমর বেঁধে প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বাংলায় জঙ্গলমহলে রেল টেকার ডাক দিয়েছে কুড়মি সংগঠন। এই আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তা প্রবীন কুড়মি নেতা অজিত মাহাতো। শনিবার এই আন্দোলন সফল করতে ঝাড়গ্রামে নেগাচারি কুড়মি সংগঠনের নেতা অনুপ মাহাতো সভার ডাক দিয়েছিলেন।

কদিন আগে পুরুলিয়ার মুরগুনার কেনকেচে পাহাড়ে কুড়মি সমাজের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব উপস্থিত হয়ে ফের লাগাতার আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে প্রায় সাত মাস আগে থেকে যে ভাবে আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে তাতে ঐ সময় জঙ্গল মহল ফের অচল হতে পারে। কেন কুড়মিদের এভাবে বার বার আন্দোলনে নামতে হচ্ছে কার দোষেে আজ কুড়মিরা গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে চলুন সেটা বিস্তারিত তুলে ধরা যাক।

ঐতিহাসিকগত ভাবে আমাদের দেশের প্রাচীন জনজাতি হিসাবে কুড়মিরা মানভুম অঞ্চলের ভূমিপুত্র হিসাবে চিহ্নিত।স্বাধীনতার আগে কুড়মিরা তফসিলি তালিকায় ছিলেন। কিন্তু পরে তফসিলি তালিকা থেকে তাঁরা বাদ পড়েন।
১৯৪৭ সালে দেশ শ্বাধীন হল। ১৯৫০ সালে দেশের সংবিধানের যাত্রা শুরু হল। সংবিধান রচনার প্রধান নীতি নির্ধারক ছিলেন পিছিয়ে পড়া মানুষের কান্ডারি বাবা ভীম রাও আম্বেদকর।কিন্তু তখন কুড়মি নেতারা জনজাতির তালিকায় নিজেদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবী জানায়নি বলে দাবী করা হয়।
কিন্তু সেই চরম ভূলের মাসুল হিসাবে দেশের পিছিয়ে পড়া অংশ হিসাবে সাঁওতাল, আদিবাসীসহ পিছিয়ে পড়া বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বিশেষ সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়। তাদের সামাজিক ও আর্থিক উ্ন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা, চাকরি রাজনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে চালু হল বিশেষ সংরক্ষণ। সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল দেশের কুড়মি জনগণ।
কুড়মি আন্দোলনের মূল দাবী

কুড়মিদের লড়াই তাদের জাতিসত্ত্বার লড়াই।তাদের ধর্মের, ভাষা, সংস্কৃতি স্বীকৃতির অধিকার সর্বোপরি সরকারি নীতি মেনে সব কিছুতেই জনজাতি হিসাবে তপশিলী জনজাতির সংরক্ষণ চাইছেন তারা। কারণ সংরক্ষণ না হওয়ায় কুড়মির কোন সুযোগ সুবিধা না পেয়ে আরও পিছিয়ে পড়ছে।তাই তাদের প্রধান দাবি, কুড়মিদের তফসিলি জনজাতি তালিকাভুক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত তাদের ভাষা কুড়মালিকে সাংবিধানিক মর্যাদা দিতে হবে এবং তাঁদের ধর্ম সারনা ধর্মকে সরকারি স্বীকৃতি দিতে হবে।
লাগাতার আন্দোলন
এই দাবীতেই জাড়খন্ড থেকে বাংলা পর্যন্ত কুড়মি আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। ২০২২ সাল থেকে জঙ্গলমহলের চার জেলা ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদনীপুর জুড়ে লাগাতার আন্দোলন জারি রয়েছে। টানা পাঁচ দিন রেল টেকা বা রেল অবরোধে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। ২০২৩ সালে রেল অবরোধ অচল করেছিল বিশাল জনজীবন। এই অবরোধের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে জনস্বার্খ মামলা হয়।কলকাতা হাইকোর্ট এই অবরোধ বেআইনি ঘোষণা করলে অবরোধ উঠে যায়।

কিন্তু কুড়মি নেতা অজিত মাহাতোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন অনুপ মাহাতো, রাজেশ মাহাতোরা। দিলীপ ঘোষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘোরাওয়ের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এই আন্দোলনের ফলে সর্বভারতীয় স্তরে প্রচার পেয়েছে।
আন্দোলনের সুফল
লাগাতার আন্দোলনের ফলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কুড়মি সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হয়।রাজ্য বিধানসভায় তাদের ভাষা ধর্মের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রস্তাব পাশ করে কেন্দ্র সরকারের কাছে ইতিমধ্যেই পাঠিয়েছে। এমনকি তৃণমূল সাংসদ অধ্যাপক সামিরুল ইসলাম সারণা ধর্মের স্বীকৃতির দাবী রাজ্যসভায় একাধিকবার তুলে ধরেছেন। যা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলায় করম পরবের ছুটি ঘোষণা করেছেন। তৈরি করেছেন কুড়মি কালচার অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট বোর্ড। সেদিক থেকে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৫০ লক্ষের কাছাকাছি কুড়মি জনগনের বিষয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহানুভূতিশীল।
কেন্দ্র সরকারের ভূমিকা
সরক্ষণ থেকে শুরু করে ভাষা ও ধর্মের সাংবিধানিক সংরক্ষণ স্বীকৃতি দেওয়ার অধিকার একমাত্র কেন্দ্র সরকার দিতে পারে। কিন্তু কেন্দ্র এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব। তার প্রধান কারণ আদিবাসীসহ বিভিন্ন জনজাতি তারা কিছুতেই কুড়মিদের সংক্ষরণের আওতায় আনার সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ তারা যে সুযোগ পাচ্ছে কুড়মিরা সংরক্ষণের তালিকায় এলে তাদের সুযোগ সুবিধায় ভাগ বসবে। মূলত এই কারণে কুড়মিদের যে দাবী বাস্তবে রূপায়িত করার পুরোপুরি বিরোধী। তাই হয়ত কেন্দ্রও পুরো বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে।কিন্তু কুড়মি জনসংখ্য বাড়ছে নতুন প্রজন্ম্ এই বৈষম্যের অবসান চাইছেন তাই এই দাবী ও আন্দোলনকে বোধহয় বেশি দিন দাবিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। সরকারে সিদ্ধান্তে আসতেই হবে।
