লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
পশ্চিম এশিয়ার এক ভূখণ্ডে দিনে – রাতে গোলা-গুলি আর আকাশ থেকে বোমা বর্ষণে নিশ্চিহ্ন গৃহস্থ পাড়া থেকে স্কুল – কলেজ, হাসপাতাল। এই ভূখণ্ডের নাম গাজা। যেখানে সততঃ পলায়মান ঘর বাড়ি হারানো, যাপন হারানো, প্রিয়জন, সন্তান হারা এক জনগোষ্ঠী যাদের বর্তমান আর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদাসীন পৃথিবী।

যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত সংঘর্ষ, গোষ্টী সংঘর্ষ, দাঙ্গা, সব সন্ত্রাসেই নিশ্চিন্ত বলি মেয়েরা আর শিশুরা। গাজাও বোধহয় তার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নিদর্শনগুলির অন্যতম।২০২৩ এর ৭ অক্টোবর প্যালেস্তাইনের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন হামাস সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে হামলা চালায়। সন্ত্রাসবাদী হামলায় প্রায় ১২০০ ইসরায়েলবাসীর মৃত্যু হয়। প্রায় ৩০০ জন ইসরায়েলবাসীকে পণবন্দী করে নিয়ে যায় সন্ত্রাসবাদীরা। এই হামলার যোগ্য জবাব দিতে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। স্থলপথে -আকাশে যুগপৎ আক্রমণ ১৯ মাস পেরিয়ে আজও চলছে। এই বিরামহীন আক্রমণে ইসরায়েল ও ভূমধ্যসাগরের মাঝে এলিয়ে থাকা একফালি ভূখণ্ড গাজা প্রায় সম্পূর্ণ বিদ্ধস্ত । এই একটুকরো ভূখণ্ড পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। রাষ্ট্রসঙ্ঘের হিসেব অনুযায়ী গাজার ৩২ লক্ষ মানুষ আজ ঠাঁই নাড়া। গাজার স্থাস্থ্য বিভাগের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই ১৯ মাসে ৫৪,০০০ এর বেশি প্যালেস্তাইন বাসীর মৃত্যু হয়েছে। এক লক্ষ তেইশ হাজারের বেশি মানুষ আহত। গাজার জনবসতি সম্পূর্ণ উজাড় হয়ে গিয়েছে। দুই উদ্দেশ্য নিয়েই ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণে নেমেছিল। এক, হামাসের হাতে বন্দী ইসরায়েলিদের উদ্ধার। দুই, গাজা থেকে হামাসকে সম্পূর্ণভাবে উৎখাত করা। কিন্তু দুটো উদ্দেশ্যর কোনোটিই এখনো পূরণ হয় নি।এই রক্তাক্ত দিনলিপির মধ্যে মাথা তুলেছে এক নিষ্ঠুর, অমানবিক পরিসংখ্যান। রাষ্ট্রসঙ্ঘের “চিলড্রেনস ফান্ড” সংস্থা জানাচ্ছে গাজার রক্তাক্ত অধ্যায় ৫০,০০০ এর ও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাজার হাজার শিশু আহত। এত রক্ত পেরিয়ে সম্প্রতি ইসরায়েলের অতি ঘনিষ্ঠ ‘ বন্ধু রাষ্ট্র’ জর্মানি, কানাডা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড সহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশ ইসরায়েল কে যুদ্ধ থামাতে চাপ দিতে শুরু করেছে। সর্বদা সাহায্যকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও সংঘর্ষ বিরতির জন্য চাপ দিচ্ছে। এই অবস্থায় গোলা- গুলি, বোমার পরিবর্তে ত্রাণ সাহায্যকে নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইসরায়েল। দুটি বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যে কয়েকটি মানবতাবাদী সূচক তৈরি হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হলো অসামরিক জনগণের জন্য ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছনোর পথ খোলা রাখা। আর পথই বন্ধ করেছে ইসরায়েল। রাষ্ট্রসঙ্ঘ সহ অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার ত্রাণ যাওয়া প্রায় বন্ধ। যার ফল, রাষ্ট্রসঙ্ঘ বলছে, প্রায় কুড়ি লক্ষ গাজার অধিবাসী অনাহারের কিনারায় দাঁড়িয়ে। বিভিন্ন মানবতাবাদী সংগঠন বলছে গাজায় দূর্ভিক্ষের ছায়া ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এই পরিস্থিতি বজায় থাকলে গাজার সম্পূর্ণ শিশু প্রজন্মের মানসিক এবং শারীরিক বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যাবে। সভ্যতার, মানবতার এই সংকটে প্রশ্ন জাগে গাজার আকাশে, মাটিতে কি মৃত্যুর ডানা ঝাপটানোর শব্দ ই জেগে থাকবে? না কি মানবতার, শুভবুদ্ধি, শান্তি কল্যাণের শঙ্খধ্বনি বেজে উঠবে?
