লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
ভারতে নির্বাচনী রাজনীতি তে ধর্ম নিয়ে খেলার কৌশল অনেক পুরনো। গত এক দশকে এই কৌশলী খেলার আয়োজন অনেক বেড়েছে। সেই আয়োজনের বহর দেখেই এই প্রশ্ন জাগছে। এই খেলার নিয়ম কানুন মোটামুটি এক। তবে, সময় বিশেষে , সুযোগ বিশেষে বদলে যায় মাঠ। সাম্প্রতিক সময়ে এই মাঠ হলো মঠ- মন্দির নিয়ে কার হিন্দুত্ব কত খাঁটি তা নিয়ে রাজনীতির চালে প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করা। এই মুহূর্তে এই খেলার নতুন মাঠের অতি বড় উদাহরণ হলো অন্ধ্রপ্রদেশ। অন্ধ্রের রাজনীতি তে আঞ্চলিক রাজনীতির রমরমা শুরু হয় এন টি রামারাও এর হাত ধরে গত শতাব্দীর আটের দশকে। তার পর থেকে চার দশক ধরে অন্ধ্রের রাজনীতির চালিকাশক্তি ছিল জাতপাতের রাজনীতি। এখন সেই নিয়ম বদলে দিয়েছেন চন্দ্রবাবু নাইডু। ক্ষমতায় ফিরে প্রতিপক্ষকে কোনঠাসা করতে চন্দ্রবাবুর হাতিয়ার দেবস্থান। সম্প্রতি এই নিয়মে তিরুমালা তিরুপতি দেবস্থানম নিয়ে বিতর্কে হুলস্থুল শুরু হয়। গতবছর সেপ্টেম্বর মাসে চন্দ্রবাবু অভিযোগ করেন তিরুপতির লাড্ডু প্রসাদে যে ঘি ব্যবহার হয় তাতে পশুর স্নেহ পদার্থ ব্যবহার হয়।আর এই ঘি সরবরাহ করে যে প্রতিষ্ঠান তাকে বরাত দিয়েছিল ক্ষমতায় থাকা জগমোহন রেড্ডির সরকার। তারপর থেকে বিভিন্ন দেবস্থান নিয়ে দুই দলের মধ্যে তুমুল চাপান উতোর চলছে। আমাদের রাজ্যেও এই কৌশলের ছায়া পড়েছে। সম্প্রতি দীঘায় কার্যত সরকারি খরচে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জগন্নাথ দেবের মন্দির তৈরি করেছেন। তারপরেই বিজেপি এই দেবস্থান কে ঘিরে পুরীর মন্দির কে সামনে রেখে নানান অভিযোগ তুলেছেন। তবে এখানে প্রতিপক্ষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় কঠিন ঠাঁই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন হিন্দি বলয়ে রাম মন্দিরের যেমন আকর্ষণ এই ভূমি খন্ডে বাঙালির কাছে ততটাই আকর্ষণ জগন্নাথ দেব। বছর বছর পুরী ঘুরে আসা বাঙালির ঘরের কাছে জগন্নাথ দেবের এই মন্দির নিয়ে আবেগের কাছে বিজেপির এই কৌশল যে ধোপে টিকবেনা তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিলক্ষণ জানেন। এই রাজ্যে ভোটে জিততে হলে সংগঠন, ক্যাডার বাহিনী ও অঞ্চলে অঞ্চলে নেতা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে বিজেপির ঘাটতি রয়েছে। এই খামতি ঘোচাতে মুর্শিদাবাদের ঘটনা, বাংলাদেশ আর পহেলাগামে সন্ত্রাসবাদী হামলার পরে বিজেপি যে হিন্দু – মুসলিম বিভাজন কে প্রধান হাতিয়ার করবে তার মমতা জানেন। তাই এই হাতিয়ার কে ভোঁতা করতে ঘরের মাঠে মমতাও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। মমতা জানেন, অপারেশন সিঁদুর নিয়ে বিজেপি রাজনীতি করবেন। তাই আগেভাগেই মমতা পাকিস্তানের সন্ত্রাস নিয়ে প্রচারে সর্বদলীয় প্রতিনিধি দলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কে পাঠিয়েছেন। মমতা জানেন যে রাজ্যের অনেক মানুষের মনে যে কোনও সমস্যার জন্য মুসলমানরা দায়ী এই ধারণা ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে বিজেপি।পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ মুসলিম। প্রায় ২৪ শতাংশ দলিত। জনজাতি ভোট প্রায় ৭ শতাংশ। বাকি হিন্দু ভোট। মুসলিম ভোট তৃণমূল একচেটিয়া পেলেও হিন্দু, দলিত ও জনজাতি ভোট কার ঝুলিতে কতোটা আসবে তা নিয়ে ধর্মীয় বিভাজনে বিজেপি কোন কৌশল নেবে আর মমতা সেই কৌশল ব্যর্থ করতে কোন চাল চালবেন তা ভবিষ্যৎ ই বলবে। তবে, রাজ্যের ভোট যতো এগিয়ে আসবে রাজনীতি ততোই যে এই পরিসরে ঘুরপাক খাবে তা নিয়ে বিশেষ সন্দেহ নেই।
