Genocide convention
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট সাংবাদিক
প্রতিদিন ক্ষুধার্ত শিশু, মহিলা, পুরুষের সামনে ত্রাণ শিবিরের হাতছানির পিছনে ওৎ পেতে থাকছে পরিকল্পিত হত্যার অস্ত্র। বোমা, গুলি অথবা অন্য কোনো যুদ্ধাস্ত্র লিখে চলেছে মৃত্যুর দিনলিপি। এই মৃত্যু উপত্যকার নাম গাজা ভূখণ্ড। যেখানে উদাসীন পৃথিবীর চোখের সামনে আকাশে, মাটিতে ছেয়ে রয়েছে মৃত্যুর গন্ধ। প্যালেস্তাইনের ইসরায়েলের অধিকৃত অঞ্চলের রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষ পর্যবেক্ষক ফ্রান্সেস্কা অ্যালবানিসের কথায়, ” ওই অঞ্চলে ইসরায়েলের সংগঠিত গনহত্যা পৃথিবীর বুক থেকে প্যালেস্তাইনদের মুছে ফেলার চেষ্টা”।
সংগঠিত গনহত্যা বা Genocide. ফ্রান্সেস্কা তাঁর সর্বশেষ রিপোর্টে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্য দেশগুলির কাছে এই পরিস্থিতি পাল্টানোর জন্য আবেদন করেছেন। যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সদস্য দেশগুলির অবশ্য কর্তব্য। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্যালেস্তাইনে genocide চলছে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক নেই। প্রশ্ন হলো যে শীত ঘুমে আচ্ছন্ন বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলি তাদের তন্দ্রা কাটবে কি না? প্রশ্ন হলো গণমাধ্যম, সমাজ মাধ্যমে বিস্তৃত এই অপরাধের ছবি আর কতদিন দৃশ্যমান থাকবে?

জঘন্যতম অপরাধ অথবা বেপরোয়াভাবে আন্তর্জাতিক আইনকে বিসর্জন দিয়ে মানবতা বিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা বোঝায় Genocide শব্দটি। চূড়ান্ত সন্ত্রাসের সংজ্ঞা নির্ধারণে অনেকগুলো স্তর রয়েছে। যুদ্ধাপরাধ, মানবতা বিরোধী অথবা Genocide । ইতিহাসের এক প্রবল অন্ধকারময় সময়ে Genocide শব্দের জন্ম। যখন এক নিষ্ঠুরতম, প্রবল হিংসা, জঘন্যতম অপরাধের সামনে দাঁড়িয়ে সেই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করার, চিহ্নিত করার শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলনা মানুষ তখন এই শব্দের জন্ম। পোল্যান্ডের এক ইহুদী আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে লেখা তাঁর বই Axis Rule in Occupied Europe এ প্রথম এই শব্দের ব্যবহার করেন। ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পোকামাকড়ের মতো আর্মেনিয়ানদের হত্যা তাঁকে বিদ্ধ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র লেমকিন তীব্র ব্যাথা মেশানো বিস্ময়ে দেখেছিলেন হত্যাকারী অটোমান নেতাদের শাস্তি দেওয়ার মতো কোনো আন্তর্জাতিক আইন নেই। লেমকিন তখন ভাবতে পারেননি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কোন নির্মম অভিজ্ঞতার সামনে তাঁকে দাঁড়াতে হবে। হলোকস্টে পরিবারের ৪৯ জন সদস্যকে হারিয়েছিলেন তিনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই ধরনের অপরাধীদের কী ভাবে চূড়ান্ত সাজা হয় সেই লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন তিনি। নাৎসি নেতাদের বিচারের জন্য গঠিত ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের শীর্ষ বিচারপতি রবার্ট এইচ জ্যাকসনের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। লক্ষ্য করেছিলেন, যুদ্ধাপরাধের জন্য নাৎসি নেতাদের বিচার হলেও, নিজের দেশের নাগরিক ইহুদীদের শুধু মাত্র জাত বিচারে হত্যার কোনো বিচার হল না।
ব্রিটিশ এবং ফরাসী বিচারপতিরা রাজি থাকলেও আমেরিকার আপত্তিতে এই অপরাধে অভিযুক্ত করে বিচার হয়নি। কারণ, আমেরিকার কালো মানুষদের বিরুদ্ধে জিম ক্রো আইনে একই ধরণের অপরাধ সংগঠিত হয়েছিল। তাই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতের আওতায় আনতে চায়নি আমেরিকা। লেমকিন তাঁর বইতে লিখেছেন, গ্ৰীক শব্দ ‘genas’ যার অর্থ জাতি আর ল্যাটিন শব্দ ‘cide’ যার অর্থ হত্যা, এই দুই শব্দের মেলবন্ধন হলো genocide । হিটলারের জার্মানিতে ঠিক এটাই হয়েছিল। ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল নিয়ে তাই হতাশায় লেমকিন বলেছিলেন, ” মিত্রশক্তি ন্যুরেমবার্গে অতীত হিটলার নিয়ে বিচার করছে কিন্তু, ভবিষ্যতের হিটলারকে কীভাবে রোখা যাবে তার পথ খুঁজতে অস্বীকার করছে”।
লেমকিনের অক্লান্ত চেষ্টায় genocide নিয়ে আইন প্রনয়নের জন্য ১৯৪৮ সালে ‘genocide convention ‘ ডাকে রাষ্ট্রসঙ্ঘ। কিন্তু, অধিকাংশ সদস্যদেশ রাজি না হওয়ায় এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে genocide এর সংজ্ঞা নিয়ে অনেকটাই আলোছায়া রয়ে গিয়েছে। যার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রসঙ্ঘ, সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্যালেস্তাইনের অবশিষ্ট অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন অথবা বিতাড়িত করার কাজ করে চলেছে ইসরায়েল। ইতিহাসের কি পরিহাস একদিন যারা নাৎসি জমানায় genocide এর শিকার আজ তাদেরই হাতিয়ার genocide ।
