বাংলায় SIR রাজনীতির অংকে কার লাভ কার ক্ষতি

SIR in West Bengal

নিজস্ব প্রতিবেদন

অবশেষে বাংলাসহ ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর বা ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া লাগু করল কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। কিন্তু কোন অজানা কারণে আসাম কে আপাতত এই প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ৪ নভেম্বর থেকে বিএলও কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা ধরে ভোটারদের অস্তিত্ব খুঁজে বের করবেন। এটা প্রথম নয়, এর আগে প্রতিটি রাজ্য বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের আগে এভাবেই ভোটার তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হয়। ভোটারের অস্তিত্ব না থাকলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয।
এবারে নতুন যে বিষয়টি যুক্ত হয়েছে সেটা হল আপনাকে সশরীরে হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করলেই হবে না যে আপনি এদেশের নাগরিক আপনি জীবিত আছেন। আপনাকেই প্রমাণ আপনি দেশের নাগরিক। যদি গত লোকসভা নির্বাচনে আপনি ভোট দিয়ে থাকেন তাতে ও প্রমাণিত হবে না যে আপনি ভারতে নাগরিক। একমাত্র ২০০২ সালে আপনার কিংবা আপনার বাবা মায়ের নাম থাকে তবে আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারেন আপনাকে ভোটার তালিকা থের বাদ দেওয়া যাবে না।আসলে ২০০২ সাল থেকে দেশে সচিত্র ভোটার তালিকা চালু করা হয়েছিল। ২০০২ সালের পর থেকে ভোটার তালিকায় নাম থাকলে ও আপনাদের ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের অংশীদার হতে গেলে আপনাকে ১১ টি নথি মধ্যে যে কোন একটি নথি বাধ্যতামূলক ভাবে দিতে হবে। এই ১১ টা নথি ইতিমধ্যে কম বেশি সকলের জানা তাই এটা নতুন করে উল্লেখ করছি না। শুধু এটুকু জানিয়ে রাখি সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশে নিমপাতা গেলার মত আধার কার্ডকে বৈধ নথি হিসাবে যুক্ত করলেও আপনাকে আধার কার্ডের সঙ্গে ১১ টির নথির যেকেন একটি যুক্ত করতে হবে।
তা দিতে না পারলে আপনার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবে। আপনি হয়ে যাবে বিদেশী নাগরিক। আপনাকে কেউ বলবেন বাংলাদেশী কেউ বলবেন রোহিঙ্গা। অথাত্ ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ঘুরিয়ে বাংলাসহ ১২ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এনআরসি বা নাগরিক পঞ্জীকরণ চালু হয়ে গেল। যেহেতু আসামে এনআরসি চালু করা হয়েছে সে কারণে ভোটার তালিকা সংশোধন থেকে আসামকে বাদ রাখা হয়েছে।
শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে দ্বিধা নেই এস আইয়ের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে দেশের বিশেষ করে বাংলার সংখ্যালঘু মুসলিমদের। কারণ বাংলার মুসলিমদের ঘুষপেটিয়া বা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী হিসাবে ইতিমধ্যেই সন্দেহজন তালিকায় রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত অস্বীকার করার উপায় নেই মুসলিমদের মধ্যে শিক্ষা থেকে শুরু করে সবক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া একটা বড় অংশের সরকারি নথি কিংবা জমির দলিল, শিক্ষাগত যোগ্যতার শংসাপত্র ইত্যাদ্দি কত জনের ঠিকঠাক আছে তা নিয়ে সন্দেহ। একই কথা প্রযোজ্য সব ধর্মের প্রান্তিক সমাজের মানুষের। কিন্তু মুসলিম ছাড়া বাকি সবাই যদি বাংলাদেশ বা প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ করে থাকে তাহলেও সিএএর মাধ্যমে তাদের দেশের নাগরিকের মর্যাদা দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে কেন্দ্র সরকার।
তবে মুশকিল হচ্ছে প্রথম পর্যায়ে ভোটার তালিকায় নিয়ম মেনে নাম তুলতে এই অংশের মানুষকে প্রবল হয়রানি ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যেমন রাজ্যের কয়েক লাখ মতুয়াদের কথাই ধরা যাক। তারা ইতিমধ্যেই ভারতে নাগরিকের মর্যাদা লাভ করেছে। সেই কবে থেকে তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন। সরকারি চাকরি থেকে সব রকম সুযোগ সুবিধা তারা ভোগ করছেন। এত বছর পর তাদের আবার নতুন করে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে প্রমাণ করতে হবে।
ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সাড়া বা আলোড়ন পড়েছে পশ্চিমবঙ্গে। তার কারণ বিজেপি নেতারা। আমাদের রাজ্যের বিজেপির বড় মেজ ছোট সবস্তরের নেতারা এমন আচরণ করছেন যেন এসআইআর চালু হলেই রাজ্যে তাদের ক্ষমতায় আসা কার্যত সময়ের অপেক্ষামাত্র।তাদের দাবী রাজ্যে মৃত ও অবৈধ ভোটারের সংখ্যা ৭০ লাখ আবার বিরোধী দলনেতা কয়েক কদম এগিয়ে দাবী করছেন সংখ্যা এক কোটি। আর এরা সবাই নাকি তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটার। তাই এক কোটির মধ্যে অধিকাংশ অবৈধ ভোটার( বিজেপির ভাষায় বাংলাদেশী রোহিঙ্গা) বাদ পড়লেন তৃণমূলের পরাজয় নিশ্চিত। এই প্রচার করে বিজেপির কর্মীদের ভোকাল টনিক দিতে শুরু করেছেন বিজেপির কেন্দ্র ও রাজ্য নেতৃত্ব।
কিন্তু তারা কি ভেবে দেখেছেন এই রাজ্যে এসআইআরের
তাদের কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে। তার কারণ এসআইআরের মাধ্যমে আসলে ঘুরিয়ে এনআরসি করতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। তাতে এমন কতগুলি জটিল প্রক্রিয়া করা হচ্ছে যাতে আম নাগরিককে নিজেদের প্রমাণ করতে হবে তারা দেশের নাগরিক। যে কাজটা দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের করার কথা আজ সেই কাজটা নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে কেন্দ্র সরকার করার চেষ্ঠা করছে।এই প্রবল বিতর্ক আছে।বিহার দিয়ে শুরু হয়েছে।প্রথমে আধারকার্ডকে নাগরিকের প্রমাণপত্র হিসাবে মানতে চাইছিল না নির্বাচন কমিশন শেষে সুপ্রীমকোর্টের নির্দেশ আধার কার্ডকে প্রামাণ্য নথি হিসাবে মানতে বাধ্য হয়েছে। তাই প্রথম থেকেই বর্তমান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নিরপেক্ষতা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যা বিহার জুড়ে ইতিমধ্যেই আলোড়ন ফেলেছে। রাহুল গান্ধির বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট চোর শ্লোগান সব মহলে সাড়া ফেলেছে। বিহারে এটাই এখন ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে বুমেরাং হয়ে ফিরেছে। সর্বশেষ যা সমীক্ষা তাতে ইন্ডিয়া জোটকে এগিয়ে রাখা হয়েছে।এই সমীক্ষার ফল যদি সত্যি প্রমাণিত হয় এবং বিজেপি জোট যদি পরাজিত হয় তাহলে তার সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়বে ২০২৬ বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে।
এবার আসা যাক বাংলায় আর কি কি ক্ষেত্রে এস আই আর বিজেপি কে বিপাকে ফেলতে পারে। প্রথমত কোনভাবেই বাংলায় অবৈধ ভোটারের সংখ্যা ষাট সত্তর লক্ষ হতে পারে না। যতই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের কথা বলা হোক না কেন এত সংখ্যায় বাংলাদেশী বাংলায় অনুপ্রবেশ করেনি। যদি অনুপ্রবেশ করে থাকে তাহলে এতগুলো নির্বাচন হয়েছে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় একটা বড় অংশ ধরা পড়ে যেত।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেত্রী থাকার সময় সচিত্র পরিচয়পত্রের দাবি করেছিলেন। তা হয়েছে। অবৈধ বাংলাদেশিদের কথা আগে তার মুখেও শোনা যেত কিন্তু সচিত্র পরিচয় পত্র চালু হওয়ার পর মুড়ি-মুরকির মত বাংলাদেশী ধরা পড়েছে এমন কোন উদাহরণ পাওয়া যায়নি। তাই যে অনুপ্রবেশটা হয়েছে তাদের মধ্যে মুসলিম সংখ্যা খুবই কম। আর রোহিঙ্গা রোহিঙ্গ বলে যারা চিৎকার করছেন তার যে সেই অর্থে কোন ভিত্তি নেই যারা দাবি করছেন তারাও জানেন। এটা শুধুমাত্র মানুষকে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে মাত্র।
আর বড় অংশের বাংলাদেশি যারা এ দেশে এসেছেন বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ও আসামে তাদের বেশিরভাগ অংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের। এখন এরাই পড়েছে সবথেকে বেশি দোটানায়। কারণ ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্র সরকার সিএএ চালু করলেও তা এখনো পুরোপুরি সবার পক্ষে করা হয়ে ওঠেনি। ফলে এস আই আর করতে গিয়ে তারাই সবথেকে হয়রানির শিকার হবেন। যারা এতদিন দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে ই ভোটাধিকার প্রয়োগ করে আসছেন তাদেরও নতুন করে পরীক্ষার মুখে ফেলে দেওয়া খুব একটা ভালোভাবে মেনে নেবে না। দ্বিতীয়ত সামাজের প্রান্তিক শ্রেণীর এই ছিন্নমূল উদ্বাস্তু পরিবার গুলির হয়রানিতে বরং আখেরে বিজেপির ক্ষতি হবার সম্ভাবনায় প্রবল। আরেকটা বিষয় দেশের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে প্রামাণ্য নথি হিসেবে নাগরিককে তাদের নিজস্ব জমি বা বাস্তুর দলিলের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশ আমাদের রাজ্যের এমন বহু ছিন্নমূল পরিবার আছেন যাদের সেই অর্থে কোন জমি নেই। সেই কারণেই চা বাগান থেকে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন আদিবাসী জনজাতির মানুষকে আজ রাজ্য সরকারকে জমির পাট্টা দিতে হচ্ছে। এখন এদের কাছ থেকে যদি জমির কাগজ যাওয়া হয় এরা পাবেন কোথায়। এইসব পিছিয়ে থাকা রাজ্যের নাগরিকের অনেকেই বিজেপিকে সমর্থন করেন। কিন্তু এই হয়রানির কারণে তারা বিজেপির বিমুখ হয়ে যেতে পারেন। অন্যদিকে বিজেপি নেতাদের লাগাতার মুসলিম বিরোধীতা, কথায় কথায় রোহিঙ্গা বলে অপমান করা ভারতীয় মুসলিমদের আত্মসম্মানে আঘাত করে। বাংলা তার ব্যতিক্রম নয়। তাই বিজেপিকে হারাতে ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলে ও বিজেপিকে আটকাতে ফের মুসলিম ভোট এককাট্টা হয়ে যারে। আর তাতে বিজেপির বিপদ বাড়বে।
অন্যদিকে এখনো পর্যন্ত রাজ্যের ৬০ হাজারের বেশি যে বুথ রয়েছে তার বহু জায়গাতেই বিজেপির সেই অর্থে কোন সংগঠনই নেই। এই ভাঙাচোরা সংগঠন নিয়ে তারা কিভাবে নিবিড় সংশোধনে কড়া নজরদারি করবেন তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। তাই সংগঠনের দিক থেকে তারা তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে অনেক পিছিয়ে। নির্বাচন কমিশনে নিবিড় সংশোধনে প্রতিটি বুথে সব দলের প্রতিনিধি থাকবেন এখন প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিটি বুথে বিজেপি তার প্রতিনিধি বসতে পারবে কি এটা হচ্ছে বাস্তব বিষয়। উল্টে আমজনতার মধ্যে ভুল বার্তা যাওয়া খুব স্বাভাবিক যে এসব জটিলতার কারণ হচ্ছে বিজেপি। যত হয়রানি বাড়বে ততই কিন্তু সাধারণ ভোটারদের বিজেপির প্রতি ক্ষোভ বাড়বে। যার প্রভাব পড়বে ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনে।