বহিষ্কৃত মহুয়া

কেড়ে নেওয়া হল সাংসদ পদ!

একপ্রকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অভিযুক্তের কণ্ঠরোধ করে লোকসভায় সম্পন্ন হল বহিষ্কার প্রক্রিয়া। সাংসদ পদ থেকে বহিষ্কৃত মহুয়া মৈত্র।

লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনে শুক্রবার এথিক্স কমিটি মহুয়া মৈত্রর বিরুদ্ধে ৪৯৫ পাতার রিপোর্ট পেশ করে। দুপুর ১২টায় অধিবেশন শুরু হওয়ার পর রিপোর্ট পেশ হওয়া মাত্র তুমুল হইচই শুরু হয়ে যায়। তৃণমূল ও কংগ্রেসের সাংসদরা ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। তাঁরা এথিক্স কমিটির রিপোর্টের কপি দাবি করেন। পরে রিপোর্টের সেই কপি বিরোধী সাংসদদের দেওয়া হলেও গন্ডগোল থামেনি। তুমুল বাগবিতণ্ডার মধ্যে শেষপর্যন্ত লোকসভার অধিবেশন দুপুর ২টো পর্যন্ত মুলতুবি করা হয়।

দুপুর ২টোয় অধিবেশন শুরু হলে, আবারও গন্ডগোল। এত পাতার রিপোর্ট পড়া ও সংসদে তা নিয়ে আলোচনার জন্য কয়েকদিন সময় দাবি করতে থাকেন বর্ষীয়ান তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ ইনডিয়া জোটের সাংসদরা। কিন্তু তাতে কর্ণপাত করেননি লোকসভার স্পিকার। এ বিষয়ে চর্চার জন্য এদিন তখনই মাত্র আধঘণ্টা সময় নির্ধারণ করে দেন তিনি! এমনকি, যাঁর বিরুদ্ধে ‘অর্থের বিনিময়ে সংসদে প্রশ্ন করা’র অভিযোগ, সেই মহুয়া মৈত্রকেই বলবার অনুমতি দিলেন না অধ্যক্ষ ওম বিড়লা। এতে তৃণমূল ও কংগ্রেস তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাঁরা একযোগে বলতে থাকেন, অভিযুক্তকে বলতে না দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী। এই নিয়ে স্পিকারের সঙ্গে তর্কাতর্কিতে জড়ান লোকসভার বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সাংসদ অধীররঞ্জন চৌধুরী।

ইউপিএ জমানার বিশেষ দৃষ্টান্ত টেনে অধ্যক্ষ ওম বিড়লা অতীতে লোকসভায় গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। অধীর প্রতিযুক্তি দিয়ে বলেন, কোবরাপোস্টের স্টিং অপারেশন আর মহুয়া মৈত্রর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এক বিষয় নয়। কারণ সে’ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ সাংসদদের নাগালেই ছিল স্টিংয়ের ছবি। এক্ষেত্রে মহুয়া মৈত্রর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ কোথায়? স্পিকার অবশ্য আর কথা বাড়াননি। কিন্তু মহুয়া মৈত্রকে বলতে না দেওয়ার ব্যাপারেও নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এরপর মহুয়ার পক্ষে সোচ্চার হন। লোকসভায় সাংসদের বক্তব্য পেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতীয় সংবিধানকে হাতিয়ার করেন তিনি। পাশাপাশি, এথিক্স কমিটির তদন্ত নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। এথিক্স কমিটির রিপোর্টে অজস্র অসংগতির অভিযোগ আনেন কল্যাণ। তাঁর অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক হল: তদন্তই করেনি এথিক্স কমিটি। অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে, কিন্তু কত অর্থ – তার উল্লেখ নেই রিপোর্টে। অভিযোগকারীদের বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে, অথচ অভিযুক্তকে সেই অভিযোগকারীদের সঙ্গে মুখোমুখি বসার সুযোগ দেওয়া হয়নি! এথিক্স কমিটির রিপোর্টে যখন এত অসংগতি, তখন আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য মহুয়া মৈত্রকে লোকসভায় বলতে দেওয়া হোক – এই ছিল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল ও যৌক্তিক দাবি।

তৃণমূল ও কংগ্রেস সাংসদদের তীব্র প্রশ্নবাণের সামনে রীতিমতো অসহায় দেখায় লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লাকে। তিনি যেন ‘নিরুপায় এবং আদিষ্ট’! স্পিকার এরপর বোঝানোর চেষ্টা করেন, সংসদ আদালত নয়। সুবিচার চাওয়া এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক। যে অসংগতির কথা বলা হচ্ছে, তা এথিক্স কমিটির পদ্ধতি সংক্রান্ত। এ ব্যাপারে লোকসভার কিছু করার নেই। লোকসভা কেবল এথিক্স কমিটির প্রস্তাবের উপর চর্চা করতে পারে।

এরপর বিহারের জেডিইউ সাংসদ বলতে উঠে মহুয়া মৈত্রর পাশে দাঁড়ান। তাঁর সাফ কথা, সাংসদদের পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে দিয়ে ব্যবহার করানো নিয়ে বাস্তবতা-বিবর্জিত অভিযোগ তোলা হয়েছে। নিজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘অনেক সাংসদই কম্পিউটারে সড়গড় নন। আপ্ত সহায়ক ও অন্যান্য কর্মীদের দিয়েই প্রশ্ন লোড করানো হয়। সংশ্লিষ্ট আপ্ত সহায়ক ও কর্মীরা সেক্ষেত্রে সাংসদের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। এটা নতুন কিছু নয়, ব্যতিক্রম তো নয়ই।’ এই শুনে অধ্যক্ষ ওম বিড়লা গুরুতর আবেদন জানান সাংসদদের। তাঁর নিদান, প্রত্যেক সাংসদকে নিজের নিজের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নিজেকেই কম্পিউটারে প্রশ্ন আপলোড করতে হবে। বর্ষীয়ান তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে প্রায় চ্যালেঞ্জ করেন। তিনি স্পিকারের উদ্দেশে বলে ওঠেন, ‘বেশি কিছু না, উপস্থিত সাংসদদের লোকসভার পোর্টালে ঢুকতে বলুন আপনি। আমি দেখতে চাই, ক’জন সাংসদ কম্পিউটার ব্যবহার করে পোর্টালে ঢুকতে পারেন!’ সুদীপের ক্ষিপ্ত মূর্তি দেখে এবারও পিছু হটেন ওম বিড়লা। ওই সময় বিজেপি সাংসদদের নীরবতা প্রমাণ করে, তাঁরাও এ ব্যাপারে অপারগ।

কিন্তু সব কিছুর শেষে ছকে বাঁধা ঘটনাই ঘটল। কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এথিক্স কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে একের পর এক প্রস্তাব পেশ করলেন। প্রতি প্রস্তাবেই ধ্বনি ভোটে মহুয়ার বিরুদ্ধে গেল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাংসদদের রায়। এবং পরিণামে লোকসভা থেকে বহিষ্কার করা হল মহুয়া মৈত্রকে।

সংসদের নিম্ন কক্ষে আজকের ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল নিঃসন্দেহে। সেই দৃষ্টান্ত কোটি কোটি ভারতবাসীর সামনে এ কথাই প্রমাণ করল – তদন্তের নিরপেক্ষতা, যৌক্তিক চেতনা, ন্যাচারাল জাস্টিস, এমনকি সংবিধানও গৌণ; সংখ্যাগরিষ্ঠতাই শেষ কথা!

এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, যেমনটা কংগ্রেসের অভিযোগ, কর্পোরেটের স্বার্থ রক্ষাই শাসকের প্রধান কর্তব্য -আরও নির্দিষ্ট করে বললে, বিশেষ বিশেষ পুঁজিপতির দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়াই ক্ষমতাসীনের প্রধান দায়িত্ব!

আজ আদানির রাতের ঘুম নিশ্চিন্ত হল নিশ্চয়।