আমরা কিছু শিখব না?
কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি! কোম্পানির কারবার যাকে বলে জমে ক্ষীর!
না। এটা কোনও সফল শিল্পোদ্যোগীর গল্প নয়।
হঠাৎ কোম্পানির বিপুল সম্পত্তি এক শিল্পপতিকে বেচে দিয়েছেন মালিক!
না। এটা কোনও স্বপ্ন-চৌচির দেউলিয়ার গল্পও নয়। বরং এ এক স্বপ্ননির্মাণের গল্প। গল্পের মতো শুনতে হলেও—ঘটনা। গল্পের মতো বাস্তব।
কানাডার নিউ ব্রান্সউইকের রাজধানী শহর ফ্রেডরিকটন (Fredericton)। তারই এক প্রান্তে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে উঠছে ছোট ছোট বাড়ি। ছোট, কিন্তু সুন্দর—স্বাচ্ছন্দ্যময়। একটা দুটো নয়, গড়ে উঠছে এরকম ৯৯টি বাসস্থান। কাদের জন্য? আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য। গৃহহীনদের জন্য। ভবঘুরেদের জন্য।
এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন। কে বা কারা করছেন এসব? উত্তর হল, এই কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে আছেন কানাডারই এক শিল্পোদ্যোগী। নাম—মার্সেল লেব্রান (Marcel Lebrun)। কিছুদিন আগেও বহু কোটি টাকার সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং কোম্পানির মালিক ছিলেন তিনি। সফল সেই উদ্যোগে হোঁচট খাওয়ার কোনও ব্যাপারই ছিল না। কিন্তু কী ভেবে যেন, এক মার্কিন শিল্পপতিকে কোম্পানিটা বেচে দিয়েছেন লেব্রান। কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে তিনি জানিয়েছেন, ‘কোম্পানি বেচে হাতে যে টাকা এসেছে, তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে গৃহহারাদের গ্রাম। তাতে মমত্বের শহর হবে আরও বেশি মনোহারী।’ কথা আর কাজে কোনও ফারাক নেই। মার্সেল লেব্রানের কারখানাতেই এখন গড়ে উঠছে ছোট ছোট সুরম্য বাড়ির বৃহৎ সংসার—12 Neighbours Gated Community!
আশ্রয়-বিচ্যুত নারীপুরুষের অভাবটা তো কেবলই মাথার ছাদের নয়, হাতের কাজেরও। ওঁরা শুধু গৃহহীন নন, জীবিকাহীনও। সে’কথা মাথায় রেখে লেব্রান তাঁর পরিকল্পনায় যোগ করেছেন কফি শপ, সিল্ক প্রিন্টিংয়ের মতো পরীক্ষামূলক কর্মসংস্থানের সুযোগ।
নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত (পড়ুন হৃদয়-উদ্ভাবিত) অলাভজনক এই প্রকল্পে মার্সেল লেব্রান নিজেই দিচ্ছেন কোম্পানি-বেচা ৩০ কোটির কাছাকাছি টাকা (ভারতীয় মুদ্রায়)! নিউ ব্রান্সউইক (New Brunswick) প্রদেশ সরকার ও কানাডা জাতীয় সরকার মিলিয়ে লগ্নি করছে মোট প্রায় ১০০ কোটি টাকা।
বুঝতেই পারছেন, এ কোনও রূপকথা নয়। এ হল রূপকথার মতো বাস্তব। কানাডার বাস্তব। আমাদের দেশের রূপকথাগুলো কেন যে বাস্তবের মাটি পায় না! কেন যে ফেসবুকের বাণীময় ইমেজ বিল্ডিংয়েই সীমাবদ্ধ থেকে যায় স্লোগানধর্মী জাতীয়তাবাদের আষাঢ়ে গল্পগুলো! কেন যে এদেশের ধনকুবেররা ঋণখেলাপি হয়ে নির্লজ্জের মতো বিদেশে পালায়! কেন যে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি কেড়ে নিতে না পারা ভারতীয় শিল্পপতি আরবিট্রাল ট্রাইব্যুনালে ক্ষতিপূরণের দাবিতে বিষ্ঠার নীলাভ মক্ষিকার মতো ভন ভন করেন, কে জানে!
কানাডা কিন্তু দেশভক্তির কাড়ানাকাড়া বাজায় না বিশেষ।
