সাসপেন্ডেড সাংসদদের হাতিয়ার হয়ে উঠল ভারতাত্মার ভজন!
গণতন্ত্রের পীঠস্থানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বৈরাচার! এছাড়া কীই-বা বলা যায় একে? লোকসভা থেকে ৩৩, রাজ্যসভা থেকে ৪৫ – সংসদের উভয়কক্ষ মিলিয়ে একদিনে, সোমবার, বিরোধী ৭৮ সাংসদকে সাসপেন্ড! আগেই ২ কক্ষ মিলিয়ে ১৫ জনকে একই ইস্যুতে সাসপেন্ড করা হয়েছিল। তাহলে কী দাঁড়াল? বাকি ৪ দিন ৯৩ জন বিরোধী সাংসদ ছাড়াই চলবে শীতকালীন অধিবেশন। কে জানে, হয়ত সাসপেনশনে সেঞ্চুরিটা করেই ফেলবে সংসদ! আর তো মাত্র ৭! শীতকালীন ইনিংসে ক্রিজ আলো করে যখন একা জগদীপ ধনখড়ই হাফ সেঞ্চুরি হাঁকানোর পথে, তখন সংসদীয় সাসপেনশনে শতরানের ভরসা করতেই পারেন কাপ্তান।
কিন্তু কী কারণে এমন ‘গণ-সাসপেনশন’? সাসপেন্ডেড সাংসদদের দোষটা কী? উত্তর: ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ ও স্লোগান। বোঝা গেল। কিন্তু কেন বিরোধীরা বিক্ষোভ করছিলেন, স্লোগান তুলছিলেন – তাও তো জানতে হবে! দাবি কী ছিল তাঁদের?
পাবলিক গ্যালারি থেকে ঝাঁপিয়ে প’ড়ে, গত বুধবার, লোকসভায় নিরাপত্তা নিয়ে রীতিমতো ছিনিমিনি খেলেছে ২ যুবক! হলুদ গ্যাস ছড়িয়ে তৈরি করেছে তীব্র আতঙ্ক। নতুন সংসদ ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে। এটাও জানা গিয়েছে যে, মহীশূরের বিজেপি সাংসদ ওই ২ অভিযুক্ত যুবকের ভিজিটর্স পাসে সই করেছিলেন। গোটা ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে। গ্রেফতারি, ইউএপিএ, জিজ্ঞাসাবাদ – সবই ঘটছে। কিন্তু যেটা ঘটা খুব জরুরি, ঘটছে না সেটাই! নিরাপত্তার প্রশ্নে এত বড় অঘটনের পরেও কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। না, ভুল বললাম। দেরিতে হলেও, এ নিয়ে কিছু কথা তাঁরা বলেছেন ঠিকই, তবে তা ‘বশংবদ’ বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমে। ফলে প্রতিকূল প্রশ্নের ঝাঁঝ সামলাতে হয়নি তাঁদের।
কিন্তু সংসদে সশরীর উপস্থিত হয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন না কেন নরেন্দ্র মোদী কিংবা অমিত শাহ? ঠিক এই প্রশ্নেই ওয়েলে নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন ও স্লোগান তোলার কাজটা করেছেন তৃণমূল ও কংগ্রেস সহ বিরোধী দলের সাংসদরা। যে ভবনে ন্যূনতম নিরাপত্তাই অনিশ্চিত, তার মর্যাদা রক্ষার স্পিকার-সুলভ অনুশাসন এক্ষেত্রে কার্যকর হয় কি? হয় না। এবং হয় না বলেই যেকোনও দায়িত্ববান প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব ক্ষেত্রে বিরোধী সাংসদদের প্রশ্নের উত্তর দিতে সংসদে হাজির হন, প্রশ্নাবলি যতই প্রতিকূল তথা তিক্ত হোক না কেন।
কিন্তু ও’পথে হাঁটলেন না কেউই। না নরেন্দ্র মোদী, না অমিত শাহ! বিরোধীদের অভিযোগ, এড়িয়ে যেতে চাইলেন তাঁরা। আর এড়িয়ে যাওয়ার সেই পদ্ধতিটি কেমন? চরম ঔদ্ধত্যের। চূড়ান্ত স্বৈরাচারের। যার পরিণাম এই ‘গণ সাসপেনশন’!
সোমবার লোকসভা থেকে সাসপেন্ডেড তৃণমূল সাংসদদের মধ্যে রয়েছেন সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, অসিত মাল, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, শতাব্দী রায়, অপরূপা পোদ্দার প্রমুখ। আর এদিনই রাজ্যসভা থেকে তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, শান্তনু সেন, নাদিমুল হক, আবিররঞ্জন বিশ্বাস, সামিরুল ইসলামদেরও সাসপেন্ড করা হয়েছে।
এভাবে বিরোধী কণ্ঠস্বর রোধ করা কীসের লক্ষণ বলুন তো? সাসপেন্ড হওয়ার পর বিরোধী সাংসদরা বলছেন, এটা কীসের লক্ষণ, তা সারা দেশ বুঝছে। তবে শুধু এটুকু বলেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না সামিরুল ইসলামরা। তাঁরা স্বৈরাচারীর সুমতি তথা ‘সন্মতি’ও প্রার্থনা করছেন। ঈশ্বরের কাছে। আল্লাহর কাছে। ভগবানের কাছে। ভজন অবলম্বনে। সংসদেরই প্রবেশপথে! প্রকাশ্যে, উদাত্ত কণ্ঠে এবং কথায়-সুরে। দেখুন সেই ভিডিও।
