অভয়ায় সরব সাবিরে নীরব কেন ? একটু ভাবুন


চারিদিকে এখন একটাই স্বর জাস্টিস ফর আর জি কর । জুনিয়র ডাক্তার তিলোত্তমার ওপর ধর্ষণ ও নারকীয় হত্যাকান্ডের ঘটনা সাধারণ মানুষকে জোর ধাক্কা দিয়েছে। সেই হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে রাজপথে নেমে এসেছে আমজনতার একটা বড় অংশ। এই জোরালো প্রতিবাদ বিশেষ করে জুনিয়র ডাক্তারদেরে সমর্থনে তাদের সমর্থনে দলীয় পতাকা ছাড়া বহু মানুষ পথে নেমেছেন এটা বেশ লক্ষ্যণীয়।
বিশেষ করে ১৪ই আগষ্ট মহিলাদের রাত দখলের ডাক সফল হওয়ার পর একের পর এক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ছে মহানগরীর রাস্তায়। তবে শুধুমাত্র তিলোত্তমা কলকাতা নয়, এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে জেলা শহরেও। বিশেষ করে সংবাদ মাধ্যম ,শয়ে শয়ে ডিজিটাল মাধ্যমে লক্ষ কোটি মোবাইলের পর্দায় আছড়ে পড়েছে আন্দোলনের টাটকা তাজা খবর থেকে সরাসরি ভিডিও। এই ডিজিটাল বিপ্লবের দৌলতে সাধারণ মানুষের মনকে , মানুষের আবেগকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছে। প্রতিবাদে স্বরটা ফেসবুকের ওয়াল থেকে টুইটার, ইস্টাগ্রাম, রিলের মধ্যে আছড়ে পড়েছে। অনেক সত্য, অনেক অসত্য, বহু গুজবের ঘনঘটায় মানুষের প্রতিবাদী মন আলোড়িত হয়েছে। তাই জাস্টিস ফর আর জি কর আন্দোলন এতটা সফল।
রাস্তায় সরকারি হাসাপাতালের ডাক্তারদের বড় অংশ, হাসপাতালে বেহাল চিকিত্সার হাল। বিনা চিকিত্সায় বহু রোগী মারা যাচ্ছেন। বিশেষ করে গরিব পরিবার গুলি যাদের বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার ক্ষমতা নেই। তাদের প্রিয়জন বিনা চিকিত্সায় মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়তে বাধ্য হচ্ছেন। আপনি যদি আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়ে এই সত্যটা বলতে চান তাতেও আপনার কথায় কর্ণপাত করার সংখ্যাটা কম। উল্টে বড় জয়ের জন্য, বড় বিচারের জন্য এই সব অসহায় মৃত্যুকে মেনে নেওয়ার কথা অনেকেই বলবেন।
বড় অংশের মানুষের মনের কথা, তাদের প্রতিবাদের আগুন আঁচ করতে পেরেছেন রাজ্যের শাসকদল তৃমমূল কংগ্রেস। তাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত আন্দোলনে কার্যত নৈতিক সমর্থন জানিয়েছেন। শুধু নৈতিক সমর্থনই নয় , মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য বিধানসভায় বিশেষ অধিবেশন ডেকে বিশেষ বিল ” অপরাজিতা ” পাশ করিয়ে আইনের জন্য রাজ্যপালের কাছে পাঠিয়েছেন। এখন দেখার রাজ্যপাল এই বিলে সই করে আইনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান কিনা। এই বিলে ধর্ষণের ঘটনার বিচার ৩৬ দিনের মধ্যে শেষ করে আজীবন কারবাস থেকে সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডের কথা বলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই আইন মহারাষ্ট্রে করার কথা বলেছেন শরদ পাওয়ার। সব মিলিয়ে আর জি করের ড্যামেজ কন্ট্রোলে সব রকম চেষ্ঠা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও আর জিকর ছাড়া আর কোন ঘটনার ন্যায় বিচারের দাবী আপাতত দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছেন। সব পথ আপাতত মিশেছে আর জি কর আন্দোলনে।
২৭ আগষ্ট ২০২৪। আর জি করের আন্দোলনের গনগনে আঁচের মাঝে খবর এল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তীর যুবক সাবির মল্লিকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে খুন করেছে হরিয়ানার গোরক্ষক বাহিনী। গোমাংস রান্না করে খেয়েছে এই সন্দেহে সাবিরকে বাড়ি থেকে তুলে এনে পিটিয়ে হত্যা করেছে। তার দেহ ময়না তদন্তের পর পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী কল্যাণ পর্ষদের সাহায্যে সাবিরের নিথর দেহ বাসন্তীর বাড়িতে আনা হয়। হত দরিদ্র এই যুবকের দেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে কবর দেওয়া হয়।
না, ভয়ঙ্কর এই হত্যাকান্ডের খবর সেই অর্থে মিডিয়ায় আলোড়িত হয়নি। ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলার জনতা নীরব। বিরোধী দল থেকে মানবাধিকার কর্মীদের বড় অংশ নীরব। বিষয়টা এমনটা হতেই পারে এটা নিয়ে প্রতিবাদে গলার স্বর তোলার খুব একটা প্রয়োজন নেই।

পশ্চিমবঙ্গ পরিযায়ী শ্রমিক কল্যাণ পর্ষদের চেয়ারম্যান সামিরুল ইসলাম বাসন্তীতে সাবির আলির বাসন্তীর বাড়ি গিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আর্থিক সাহায্য তুলে দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাবিরের স্ত্রী কন্যার সঙ্গে দেখা করে তাঁর হাতে সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র তুলে দিয়েছেন। আপাতত এ পর্যন্তই নিহত সাবির আলির পরিবারের কাছে স্বান্তনা। কিন্তু নাগরিক সমাজের দিক থেকে কোন প্রতিবাদের জোরালো স্বর শোনা গেল না। এখান থেকেই প্রশ্ন ওঠে সাবির আলিদের জন্য আপাতত ভাবার প্রয়োজন নেই।
অথচ বাংলার খেটে খাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর বার বার সংগঠিত ভাবে আক্রমন নেমে আসছে। বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর রাজ্যের বাইরে বার বার আক্রমনের ঘটনাা ঘটেই চলেছে। কিন্তু জোরালো কোন প্রতিবাদ নেই বলে কয়েক দিন পর এই সব মর্মান্তিক ঘটনা চাপা পড়ে যায়।
ওড়িশায় ভোটের আগে থেকে এখনো পর্যন্ত বাংলা পরিযায়ী শ্রমিকদের বিশেষ করে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বাংলাদেশি বলে পরিকল্পিতভাবে মারধর করা হচ্ছে।
আপনাদের নিশ্চয় মনে থাকবে ২০১৫ সালে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে ফ্রিজে গোমাংস রাখা হয়েছে সন্দেহে আখলাখকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল। এই ঘটনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সব রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন সমাজকর্মী আখলাখ হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে পথে নেমেছিল। প্রবল চাপের মুখে পড়েছিল শাসক বিজেপির যোগী আদিত্যনাথের সরকার।
আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে রাজস্থানের পেহেলু খানের হত্যাকান্ডের কথা। ২০১৭ সালে একটি গাড়িতে পেহেলু খান ও তাঁর দুই ছেলে রাজস্থানের জয়পুরের এক পশু মেলায় যোগ দেওয়ার পর গরু কিনে হরিয়ানা ফিরছিলেন। দিল্লি-জয়পুর ন্যাশনাল হাইওয়েতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা পেহেলু খান ও তাঁর ছেলেরা গরু পাচার যুক্ত সন্দেহে মাটিতে ফেলে ঘাড় ধরে চলতে থাকে মারধর। শেষে মৃত্যু হয় পেহেলু খানের। এই ঘটনাতে দেশ জুড়ে আন্দোলন তৈরি হয়েছিল। বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব তাদের সরকারি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। মনে থাকবে মালদার আফরাজুল শেখকে রাজস্থানে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর এই বর্বর আক্রমন ঘটেছে। প্রতিবাদে আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু এবার সাবির আলির বর্বর হত্যাকান্ডের পর নাগরিক সমাজ কেন জানি না একেবার নীরব।
আজ অভয়ার বিচার চেয়ে লাখো মানুষ রাজপথে নেমেছেন। হয়ত সাবির আলির বাসন্তীর বা়ড়ির পাশের রাস্তাতেও আমজনতা উই ওয়ান্ট জাস্টিস চাইছেন অভয়ার জন্য। শুনছেন দেখছেন সাবিরের স্ত্রী ও তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটি। হয়ত ভাবছে তাঁর নিহত স্বামীর জন্যে কেউ কি কোন দিন পথে নামবে না ? এই প্রশ্নের উত্তর আপাতত জানা নেই।।