এবারে শীতে সংসদে রাজনীতির চৌষট্টি খোপে বন্দি বাবা সাহেব আম্বেদকর

লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

সামাজিক অন্যায়, ভয়ঙ্কর বৈষম্য ও সীমাহীন অবজ্ঞার বিরুদ্ধে এই প্রনম্য যোদ্ধার কি এটা ই প্রাপ্য ছিল? হয়তো ছিল। জীবদ্দশা থেকেই যে ভক্তি ডালা তাঁর উদ্দেশে সাজানো হয়ে আসছে তাতে কীট দংশতি ফুলের ই প্রাধান্য। এটিও অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলির প্রায় সবাই প্রতারণা ও দ্বিচারিতার শৈল্পিক প্রয়োগে অত্যন্ত কুশলী। যে আম্বেদকর ভজনা এখন রাজনীতির উঠোনে ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে তার প্রতিটি স্তরে এর প্রমাণ রয়েছে। ‘Annihilation of Caste”. বিপুল মেধা আর প্রখর প্রতিভা সম্পন্ন আম্বেদকর প্রবল সামাজিক নিষ্ঠুরতা ও অশ্রদ্ধার পাহাড় ঠেলে এগোতে এগোতে যে তিক্ত, বিষময় অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন তার ই ফসল এই পঞ্চাশ পাতার পুস্তিকা। বিশ্বে সামাজিক ন্যায় বিচারে বঞ্চিত, অবহেলিত মানুষদের সামনে বাধা ও তার থেকে উত্তরণে এক হিমালয় তুল্য দলিল এই পুস্তিকা। সমাজের অতি প্রান্তিক দলিত মাহার সম্প্রদায়ের সন্তান ছিলেন আম্বেদকর। তাই টলমল পায়ে চলার দিন থেকে জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত দেখেছিলেন জন্মদাগ কী পরিমাণ ঘৃণার বস্তু হতে পারে। অবহেলা অনাদরের জীবন শেষে মৃত্যু তে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে আদিখ্যেতা দেখে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কলম লিখেছিল ,”ফুলগুলো সরিয়ে নাও আমার লাগছে”। চোখ খোলা রেখে কান পাতলে শুনতে পাবেন বাবা সাহেব ও ওই অমোঘ উচ্চারণে ঠোঁট মেলাচ্ছেন। হিন্দু সমাজের অন্তঃস্থলে যে চরম বৈষম্যে এবং অনাচার রয়েছে তার দূর করার জন্যই যাবতীয় রণসাজ ছিল আম্বেদকরের। সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো তো দূরের ব্যাপার ক্রমশ ই যেন পিছন পানে হাঁটছে স্বাধীন ভারত। ধুপ, ধুনো, আরতি সরিয়ে রেখে আম্বেদকরের পথে হাঁটলে যে পরিবর্তন আসতো তা যেন ক্রমশই দূরে সরছে। যে দলিত, আদিবাসী, পিছিয়ে পড়া মানুষদের সম্মানের সঙ্গে বাঁচার পরিবেশ গড়তে চেয়েছিলেন বাবা সাহেব তাদের অবস্থা আজ কী রকম? কিছু পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখলেই তা স্পষ্ট হবে। মানুষের জৈবিক বর্জ্য অপর মানুষকে দিয়ে সাফ করানো দেশে আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু এই কাজ সবচেয়ে বেশি করিয়ে থাকে ভারতীয় রেল। এই কাজ এবং নর্দমা ও সেপ্টিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার কে উপার্জনের পথ হিসেবে বেছে নিতে যারা বাধ্য হন তাদের নব্বই শতাংশই তফসিলি সম্প্রদায়ের। এই কাজে যারা যুক্ত থাকেন তারা শুধু মানুষের প্রাপ্য সম্মান থেকে ই বঞ্চিত নয় তাঁদের সুরক্ষা ব্যবস্থা ও কিছু ই থাকে না। ফলে চরম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে অনেকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পরও ন্যায় বিচার পাওয়ার সংখ্যা হাতে গোনা। National Crime Records Bureau এর রিপোর্ট বলছে ২০১৫-২০২০ সালের মধ্যে দলিত মেয়েদের ধর্ষনের ঘটনা ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্য একটি সমীক্ষা বলছে দেশে প্রতি আঠারো মিনিটে একটি দলিত পরিবার শারীরিক নিগ্ৰহের শিকার হয়। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে দলিত শিশু রা স্কুলে চুড়ান্ত বৈষম্যের শিকার। শৈশবে আম্বেদকর ও এই এক ই রকম পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। শহরে কিছু টা ব্যতিক্রম হলেও ভারতের গ্ৰাম মফস্বলে গেলেই উচ্চবর্ণে আর নিম্নবর্ণের ঘর গেরস্থালির মাঝে সীমারেখা চোখে পড়বে। ছয় ডিসেম্বর আম্বেদকরের মৃত্যু দিন। সেদিন বাবা সাহেব কে শ্রদ্ধা জানাতে হাজারে হাজারে দলিত সম্প্রদায়ের দরিদ্র, অতিদরিদ্র মানুষ মুম্বাই তে উপস্থিত হন। বৌদ্ধ স্তুপের আদলে তৈরি “চৈত্যভূমি” তে তাঁরা বাবা সাহেব কে শ্রদ্ধা জানান। সঙ্গতি না থাকায় দূর দূরান্ত থেকে এসে তাঁরা ফুটপাতে, পার্কে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান।ভোর হলে দলে দলে দুহাতে শ্রদ্ধা ভরে চৈত্যভূমি তে গিয়ে উপস্থিত হন । তাঁদের হাতে বাবা সাহেবের ছবি বা বাজুতে badge থাকে না। থাকে না উচ্চস্বরে স্লোগান। শুধু অনাবিল ভক্তি, আর নিবেদন নিয়ে এগিয়ে চলে জনস্রোত। ছয় ডিসেম্বর আরব সাগরের তীর থেকে এইটুকু তো কুড়িয়ে আনতে পারেন রাজনীতির কারবারিরা !

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *