লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
…..এই ভারতের মহামানবের, সাগর তীরে….. সেই কোন ছোটবেলায় এই মন্ত্র কানে বেজেছিল। এই শব্দবন্ধের ব্যাপ্তি, আবেশ, বৈচিত্র্যের বিশালতা শরীরের প্রতিটি অনুতে সুরে বাজতে থাকে কুম্ভমেলায়। মেলার বিস্তৃত প্রান্তরে দাঁড়ালে অভিন্ন ভারতের কোলাজ মাখানো আকাশ, বাতাস, জল উদার গৃহস্থের মতো ভিড়ের আপ্যায়নে মত্ত সেই বিহান বেলা থেকে রাত্রি নিশীথেও মেলে ধরে নিজেকে। ভাষা, ভূগোল, সংস্কৃতি, অস্ফুট আলো থেকে যুবা রোদ থেকে অন্ধকারের জাজিমে গড়িয়ে চলে অভিন্ন ভারত আত্মা। বোড়া- বিস্তরা মাথায় দেহাতের মানুষ, ফাটা পায়ের পাশে বহুজাতিক সংস্থার জুতো, আলুথালু আলোয়ানের পাশে টি শার্ট, জিন্স এর একত্র কুচকাওয়াজ। একপাশে অজস্র তাঁবু, তার থেকে কিছুটা দূরে খোলা আকাশের নিচে হিমেলা হাওয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ। এক সুরে ই দুই ভারতের নিশি যাপন। তবে ধর্মের, পুন্যের এই তীব্র আকাঙ্খার প্রান্তরে দ্বিমুখী লাভের আশা দেখেছেন হিন্দু হৃদয় সম্রাট হয়ে উঠতে চাওয়া উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। মহাকুম্ভের এই মিলন মেলায় ধর্মের কল্লোলিনী স্রোতের নিচে যে অর্থনীতির স্রোত বইছে সেদিকেও প্রখর দৃষ্টি রয়েছে তাঁর। ২৬ শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহমান মহাকুম্ভে এবার ৪০ কোটি গণ দেবতা তাঁদের দেবতার সঙ্গে মুখোমুখি হবেন বলে মনে করা হচ্ছে। মেলা সফল করে তুলতে ৫৪৯টি প্রকল্পে ৬,৯৯০কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করেছে যোগী সরকার। মেলা কর্তৃপক্ষের অনুমান এই মিলনস্থল থেকে ২৫০০০কোটি টাকা ঢুকতে পারে রাজ্য সরকারের লাভের ঘরে। তাই তো দিন প্রতি এক লক্ষ টাকা ভাড়ায় তাঁবুর পাশাপাশি রয়েছে বাজেট হোমস্টে। পূজা উপাচারের বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নৌকার মাঝি থেকে কর্পোরেট সংস্থা হাজির কড়ি লাভের আশায়। এলাহাবাদ থেকে পরিবর্তিত প্রয়াগরাজে অনাদিকাল থেকে তিন নদীর সঙ্গমে কুম্ভমেলা হয়ে আসছে বলে লোকমুখে ভাসে। নদীতীরের চার হাজার একরে বিস্তৃত মেলায় বিলাসবহুল থেকে সাধারণ ভাড়ার তাঁবুর পাশাপাশি রয়েছে বিকিকিনির স্টল। মেলা কর্তৃপক্ষ স্টল ভাড়ার জন্য টেন্ডার ডেকেছিলেন। সেখানে দর উঠেছে এক কোটি থেকে দু কোটি টাকা। পাশাপাশি রয়েছে ভাসমান জেটি, জল ক্রীড়া ও মন্দির পর্যটনের সুব্যবস্থা। অবশ্য ই অর্থের বিনিময়ে। মেলা প্রাঙ্গণে এক লক্ষ ৬০ হাজার তাঁবু রয়েছে। যার মধ্যে ২,২০০ টি লাক্সারি টেন্ট, ব্যক্তিগত শৌচালয়, উষ্ণ রাখার ব্যবস্থা, ওয়াইফাই সংযোগ সম্পন্ন ডিলাক্স টেন্টের ভাড়া দিন প্রতি ১৮০০০ থেকে ২০০০০ টাকা। ৪৪টি সুপার লাক্সারি টেন্ট রয়েছে যার ভাড়া এক লক্ষ টাকা প্রতি রাত্রি। উত্তর প্রদেশ রাজ্য পর্যটন উন্নয়ন নিগমের চার ধরনের টেন্ট ভিলা, মহারাজা, সুইস কটেজ এবং ডরমিটরি রয়েছে। ডরমিটরি তে রাত্রি বাসের জন্য ১৫০০ টাকা এবং ৩৫০০০ টাকা ভাড়া অন্যগুলিতে। উত্তর প্রদেশ পর্যটন বিভাজন প্রতি ১২৯৬ টাকা ভাড়ায় হেলিকপ্টারে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও রেখেছে। এছাড়াও এবার মহাকুম্ভে রয়েছে এক অভিনব ব্যবস্থা। নাগা সাধু, অঘোরি সম্প্রদায় এবং কল্পবাসীদের সম্পর্কে তীব্র কৌতুহল রয়েছে সাধারণ মানুষের। এবার মেলায় সেই আবছায়া জগৎ সচক্ষে দেখতে পাওয়া যাবে আখড়ায় প্যাকেজ ট্যুরে গিয়ে। আড়াই থেকে পাঁচ ঘণ্টার সেই ট্যুরে খরচ পড়বে ২০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা। মেলার প্রস্তুতি লগ্নেই ধর্ম বিশ্বাস আর অর্থনীতির মেলবন্ধন করেছিল যোগী আদিত্যনাথ। বলেছিলেন, “শাস্ত্র সে অর্থ ব্যবস্থাতক” সব ব্যবস্থা ই থাকবে। জানিয়েছিলেন আর্থিক লেনদেনের বহর হবে দুলক্ষ কোটি টাকা।
