জ্যোতি বসু সঠিক ছিলেন, প্রকাশ কারাটের বিলম্বিত বোধদয়

লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

ভারতের দুই কম্যুনিস্ট পার্টি পা দিয়েছে শতবর্ষে। আর এস এস এর বয়স ও একশো হল । অর্থাৎ, ভারতের দুই বামপন্থী দল ও দক্ষিণপন্থী সংগঠনের একই সময় পথ চলা শুরু। কিন্তু, জন্মলগ্ন থেকে শতবর্ষ পরে সমাজে, রাজনীতিতে প্রভাব, প্রতিপত্তিতে আর এস এস এর পাশে নিতান্তই বামন দেখাচ্ছে দুই কম্যুনিস্ট পার্টি কে। জন্মলগ্নে অবশ্য ছিল অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টি। মুনি ঋষিরা নাকি ত্রিকালজ্ঞ হন। তাঁরা ভবিষ্যৎ দেখতে পান। লোকমুখে এরকম ধারণা বহুল প্রচারিত। তবে আমার ব্যক্তিগত মত হলো সামাজিক বা রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে এমন অনেক ব্যক্তি ভারতে জন্মেছেন যাঁরা আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ভবিষ্যতে কোন পথে যেতে পারে তার বাস্তব সম্মত অনুমান করতে পেরেছিলেন। তেমনই এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতি বসু। সম্প্রতি নিউটাউনে জ্যোতি বসুর নামাঙ্কিত “Center for research and social studies” এর প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন করলেন সিপিএমের পলিটব্যুরোর কোঅর্ডিনেটর প্রকাশ কারাট। উদ্বোধন করে প্রকাশ কারাট প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কথা উদ্ধৃত করে বলেন, “বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে জ্যোতি বাবু এই শক্তি কে অসভ্য, বর্বর বলেছিলেন। তারা এখন রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেছে। হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রের দর্শনে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। কেবল নির্বাচন নয়, মতাদর্শের লড়াই ও করতে হবে এই শক্তির বিরুদ্ধে”।এই অনুধাবনে বড় বেশি সময় নিলেন প্রকাশ কারাট রা। সংসদীয় ব্যবস্থায় দলের চলন কোন পথে হবে, তা নির্ধারণে জ্যোতি বসুর পাশাপাশি বড় ভূমিকা ছিল ই এম এস নাম্বুদিরিপাদের। লন্ডনে ব্যারিস্টারির পাঠ শেষ করে দেশে ফিরে কম্যুনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন জ্যোতি বসু। রেলে ট্রেড ইউনিয়নের নেতা থেকে সংসদীয় কাঠামোয় কম্যুনিস্টদের ভূমিকায় নেতৃত্ব দিয়ে এক সু -বিশাল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর ছিল বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের অসীম দক্ষতা। একজন প্রকৃত নেতার “ভিশন” থেকেই জ্যোতি বসু গত শতকের শেষ ভাগ থেকে বুঝেছিলেন ভবিষ্যতে কম্যুনিস্ট পার্টির সামনে কোন রাজনৈতিক শক্তি সবচেয়ে বড় “বিপদ” হয়ে দেখা দিতে চলেছে। তাই বাবরি ধ্বংসের পরে জনসভায় বা অন্য মঞ্চে জ্যোতি বসু বলতেন ‘ ‘বিজেপি অসভ্য, বর্বরের দল’। বলতেন, “আমায় প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী বলেছেন আপনি আমাদের অসভ্য, বর্বর কেন বলেন? আমি বলেছি, তা আর কি বলব? অভিধানে অন্য কোনো শব্দ থাকলে দেখান”। সমাজও রাজনীতির চলনকে বুঝে নেওয়ার এই প্রখর জ্ঞান থেকেই জ্যোতি বসু “প্রধান রাজনৈতিক শত্রু” র অবস্থানে কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি কে বসিয়ে ছিলেন। তাই এই শতকের প্রথম ভাগে দলীয় মুখপত্রের শারদীয় সংখ্যায় নিজের লেখায় কংগ্রেস সম্পর্কে সমালোচনার সুর নরম করেছিলেন তিনি। শুধু, তাই নয়, এই রাজনৈতিক অনুমান থেকেই ২০০৪ সালে বিজেপি কে রুখতে কংগ্রেস নেতৃত্বে প্রথম ইউপিএ সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন করেছিল সিপিএম। সেদিন দলকে এই পথে চালিত করে ছিলেন জ্যোতি বসু, হরকিষন সিং সুরজিত রা। সেই সরকার কে ধনবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাসী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং “মডেল সরকার” বলে অভিহিত করেছিলেন। সেদিন যখন আমেরিকার সঙ্গে অ-সামরিক পরমাণু চুক্তি করায় আপত্তি জানিয়ে প্রকাশ কারাট রা সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে ছিলেন তখন তাতে তীব্র আপত্তি ছিল জ্যোতি বসুর। সেদিন দলের গোলা থেকে এই বিপুল রাজনৈতিক ফসল অনাদরে রেখে এক অবাস্তব নীতি কে আঁকড়ে ধরে ছিলেন প্রকাশ রা। দলের প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক পুঁজি সেদিন হেলায় সরিয়ে না রাখলে আজ হয়তো দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে সিপিএম এর অস্তিত্ব এতো ছোট দেখাতো না। তাই মনে হয়, জ্যোতি বসু শরণে বড় দেরিই করে ফেললেন প্রকাশ কারাটরা।