এমনি কী আর ‘গ্লোবাল টিচার’!
ছোটরা মাঠে-ঘাটে খেলে বেড়াত। ঘাসজমিতে গৃহপালিত পশুপাখি চরাত কেউ কেউ। বড়রা যেতেন খাটাখাটনি করতে। লাঙল চষা, মাটি কুপোনো, কাঠ কাটা, পাতা কুড়নো—এইসব কাজ আর কী! নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে মুখে বলতে পারতেন—কাগজে-কলমে লিখতে পারতেন না। সরকারি নথির খাতায় দিতেন টিপসই। বাজারে এটা-ওটা কিনতেন—হিসেব করতে পারতেন না। ফলে ঠকতেও হত দেদার।
এখন অবশ্য সে’দিন নেই। ছোট-বড়, সকলেই গোটা গোটা অক্ষরে নিজের নাম-ঠিকানা লিখতে পারেন। হিসেবপত্তরেও বুদ্ধি খুলেছে। আনপড় ভেবে ঠকিয়ে নেবে কোনও জালিয়াত—সেটি আর হচ্ছে না!
সেটি যে আর হচ্ছে না, সকলে কমবেশি লিখতে পড়তে পারছেন—এ’সবই সম্ভব হয়েছে এক শিক্ষকের দৌলতে। এলাকায় তাঁর জনপ্রিয় পরিচিতি ‘রাস্তার মাস্টার’! প্রকৃত নাম: দীপনারায়ণ নায়েক।
এতক্ষণ যে গ্রামের কথা বলছিলাম, সেটা বাঁকুড়া জেলার জামুড়িয়ার #তিলকামাঝি। থাকেন মূলত আদিবাসীরাই। লেখাপড়াকে স্কুলের চৌহদ্দি ছাপিয়ে এই তিলকাবাঝির পথেপ্রান্তরে ছড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষক দীপনারায়ণ নায়েক। রাস্তাই হয়ে উঠেছে ক্লাসরুম।
দীপনারায়ণ নিজে অভাবী পরিবারের সন্তান। বহু কষ্টের ভিতর দিয়ে শিক্ষালাভ। হয়ত সে কারণেই, বিদ্যার গুরুত্ব তিনি বুঝেছেন জীবনসংগ্রামের মূল্যে। হয়ত সে কারণেই, আর্থিক দুরবস্থায় কেউ বিদ্যাবঞ্চিত হোক, এ তিনি চাননি। উদ্যোগ নিয়েছিলেন মাঠে-ঘাটে পড়ানোর। লকডাউনের সময় সেই উদ্যোগ ডালপালা মেলে। এখন তিলকামাঝির বাচ্চা থেকে বুড়োবুড়ি, সব বয়সের পড়ুয়া পথের পাঠশালায় লেখাপড়া শিখতে আসছেন দীপনারায়ণের কাছে।
এমন অসামান্য প্রয়াস নজর এড়ায়নি গুণগ্রাহীদের। উলটে সাড়া ফেলেছে আন্তর্জাতিক মহলেও। আগামী মাসের ৮ তারিখ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেতে চলেছেন দীপনারায়ণ নায়েক। পেতে চলেছেন ‘বিশ্বশিক্ষক সম্মাননা’ (Global Teacher Award)। অনন্য মাস্টারমশাইকে অমৃতBAZAR-এর কুর্নিশ।
তিলকামাঝির রাস্তাই রাস্তা দেখাক বিশ্বকে। রাস্তা দেখাচ্ছেন ‘রাস্তার মাস্টার’।
