এস আই আর বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের বড় বিপদের মুখে ফেলতে পারে

SIR & West Bengal Migrant Worker Crisis
মনিরুল হোসেন

সব সমস্যার বিষয়কে পিছনে ফেলে এখন সবার মুখে মুখে একটাই বিষয় এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন। ভোটার তালিকার সংশোধন এটা নতুন নয়, লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন আসার আগেই বার বার এটা করেই থাকে নির্বাচন কমিশন। কোন সময় এই বিষয়টিকে নিয়ে এত আলোচনা, এত উৎকণ্ঠা, রাজনৈতিক তরজা চোখে পড়েনি। হুংকার পাল্টা হুংকারে রীতিমতো সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল উৎকণ্ঠা তৈরি হচ্ছে‌।ইতিমধ্যেই এই দুশ্চিন্তায় কয়েকজন আত্মহ্যার পথ বেছে নিয়েছেন। এখন বিষয় হচ্ছে এই উৎকণ্ঠার কি সত্যিই কি বাস্তব বিষয় আদৌ আছে, না শুধুমাত্র বাজার গরম করা হচ্ছে।
আসলে এবারের নিবিড় ভোটাধিকার সংশোধনের মধ্যে এমন কিছু বিষয় বা প্রামাণ্য নথি আপনাকে জমা দিতে হচ্ছে যার মাধ্যমে এটা পরিষ্কার একদিকে নির্ভুল ভোটার তালিকা যেমন তৈরি হচ্ছে অন্যদিকে আপনি দেশের নাগরিক কিনা আপনাকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে। যে কাজটা রাষ্ট্রের করার কথা, যে কাজটা দেশের স্বরাষ্ট মন্ত্রকের করার কথা সেই কাজটা নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে করানো হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠছে নির্বাচন কমিশনের কাজের পরিধি ও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে নির্বাচন কমিশন কেন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণ যাচাই করছে। কারণ আমার ভোটার তালিকায় নাম সুরক্ষিত করতে ২৩ বছর আগে অর্থাৎ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার কিংবা আমার পিতা-মাতার নাম থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ যে ১২ টি নথির মধ্যে অন্তত একটি নথি কে প্রামাণ্য হিসেবে ধরা হচ্ছে এমন বহু মানুষ আছেন আমাদের রাজ্যে এবং আমাদের দেশে সমাজের সেই পিছিয়ে পড়া অংশ শিক্ষাক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষেত্রে তাদের অনেকের কাছেই না আছে জন্ম সঠিক না আছে বাড়ির দলিল ইত্যাদি ইত্যাদি তাহলে তাদের কি হবে।
যে নথি সবার কাছে আছে তা হল আধার কার্ড ও ভোটার কার্ড । কিন্তু এই ভোটার তালিকার গুরুত্ব নেই। সুপ্রীম কোর্টের চাপে আধারকার্ড গ্রহণ করা হচ্ছে কিন্তু একই সঙ্গে আধারকার্ডে সঙ্গ অন্য নথি যুক্ত করতে হচ্ছে। অথচ যে আধারকার্ড কেন্দ্র সরকার প্রদান করেছে জমি বাড়ি কেনা থেকে স্কুল কলেজ ঙসপাতালে ভর্তি ব্যাঙ্কের লেনদেন সব ক্ষেত্রেই আধারকার্ড বাধ্যতা মূলক করা হয়েছে। কিন্তু নির্বাচম কমিশনের কাছে কোন দাম নেই।
এই পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে দেশের পরিযায়ী শ্রমিকদের কিভাবে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিখুত ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
যেটুকু ভাসা ভাসা জানা গেছে যে অন্যান্য রাজ্যে কর্মরত ব্যক্তিদের যদি বাংলার ভোটার তালিকায় তাদের নাম নথিভুক্ত করতে চান, তাহলে তাদের একটি লিখিত ভাবে জানাতে হবে যে তাঁরা যে রাজ্যে কাজ করছেন সেই রাজ্যের ভোটার হিসেবে তাদের নাম ভোটার তালিকায় নথিভুক্ত নেই।

জানা গেছে যে পরিযায়ী স্রমিকদের অনলাইনে এই ফর্ম পূরণ করার অনুমতি দেওয়া হবে। বাংলায়, ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফর্ম ফর্ম বিতরণ করা হবে।সেখানেও তাদের পরিজনরা নাম তুলতে পারেন। এছাড়া বিহারের মতো, একটি QR স্ক্যানারের মাধ্যমে অন্যান্য রাজ্যে কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকরা অনলাইনে ফর্ম জমা দিতে পারেন।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন বিভিন্ন রাজ্যে বর্তমানে ২২ লক্ষ বাংলার পরিযায়ী শ্রমিক বিভিন্ন রাজ্যে কাজ করছেন। করোনা মহামারির সময় পশ্চিমবঙ্গে ৪০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ফিরে এসেছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবে সংখ্যা ২২ লাখে চেয়ে বেশিই হব। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকরা এসাইঈআরের জন্য সব কাজ ফেলে কি বাড়ি ফিরে আসবে সে সম্ভাবনা খুব কম। কারণ যাতায়াতের বড় খরচ। দ্বিতীয় নির্বাচন কমিশন উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে অন লাইন ব্যবস্থা করলেও তা কতটা কার্যকরী হবে তা নিয়ে যথেষ্টসংশয় আছে। কারণ অধিকাংশের কাছে এই সুযোগের ব্যবস্থাই নেই। একমাত্র নির্বাচন কমিশনকেই উদ্যোগ নিতে হবে তাদের কাছে পৌচ্ছে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য। নির্বাচন কমিশন সে ব্যবস্থার কোন পরিকল্পনা আছে কিনা জানা নেই। তাই দুশ্চিন্তা থেকেই গেল।

ইদানিং বাংলার পরিয়ায়ী শ্রমিকদের নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। বাংলা ভাষায় কথা বললেই তাদের বাংলাদেশী বলে দাগিয়ে দেওযা হচ্ছে।বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্য গুলিতে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটছে। আপনারা জানেন ইতিমধ্যেই বিজেপি রাজ্যের পুলিশ ও বিএসএফের সাহায্য নিয়ে বাংলার বেশ কয়েকজনকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করেছিল। মালদার আমির শেখকে অনেক চেষ্ঠা করে ফিরিযে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের জেলে এভাবেই রয়েছে সোনালি বিবি সহ ৬ জন। কলকাতা ইাইকোর্ট রায় দিয়ে দিয়েছে তারা সকলেই ভারতের নাগরিক তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতেই হবে। বাংলাদেশের কোর্ট জানিয়েছে এরা সকলেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। তবু কেন্দ সরকার কোন সাড়াশব্দ করছে না। বাস্তব অবস্থা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন । তাই এসআইআর আর এক বিপদ ডেকে নিয়ে আসছে বাংলার পরিয়ায়ী শ্রমিকদের কপালে।
তাই তাদের দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে কেন্দ্র সরকার কি ভাবছে, নির্বাচন কমিশন কি ভাবেছে সেটাই দেখার। তা না হলে আগামী দিন নিজের দেশের নাগরিকের অধিকার নিয়ে বড়সড় বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হবে।