নিউমার্কেটের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: মৃত্যু অন্তত ৯ জনের, মৃতদের মধ্যে ৫ জন বাংলাদেশি নাগরিক

Big Fire in Kolkata

বিশেষ প্রতিবেদন, কলকাতা: শহর যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই মধ্যরাত্রে কলকাতার হৃদপিণ্ড নিউ মার্কেট এলাকায় নেমে এল চরম বিপর্যয়। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক দুটো নাগাদ নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ নামের একটি হোটেলে আচমকাই ভয়াবহ আগুন লাগে। প্রাথমিক তদন্তে দমকলের অনুমান, ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট থেকেই এই অগ্নিকাণ্ডের সূচনা।

সংকীর্ণ ও ঘিঞ্জি ঘর কাঠামোর কারণে মুহূর্তের মধ্যে ঘন কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা হোটেলের করিডর ও সিঁড়ি। ঘুমের ঘোরে আটকে পড়া আবাসিকদের মধ্যে হুড়োহুড়ি ও চরম আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ধোঁয়া ও আগুনের হাত থেকে বাঁচতে কয়েকজন আবাসিক হোটেলের বাথরুমে আশ্রয় নেন, আবার অনেকে জীবন বাজি রেখে ভবনের পেছনের জরুরি লোহার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসতে সক্ষম হন। তবে ধোঁয়ার তীব্রতায় ও আগুনে পুড়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান অন্তত ৯ জন।

মর্মান্তিক এই ঘটনায় মৃত ৯ জনের মধ্যে ৫ জনই বাংলাদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। খবর পেয়ে দমকলের একাধিক ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এটিই কলকাতার বুকে সাম্প্রতিকতম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, যা শহরের বাণিজ্যিক এলাকার হোটেল ও ভবনগুলির অগ্নিসুরক্ষা নিয়ে আবারও বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।

এক নজরে: গত দুই দশকে কলকাতার সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডসমূহ

গত ২০ বছরে তিলোত্তমার বুকে ঘটে যাওয়া একাধিক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড বারবার কেড়ে নিয়েছে বহু প্রাণ এবং ধ্বংস করেছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। নিচে গত দুই দশকের কিছু বড় দুর্ঘটনার সংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

  • তপসিয়া চামড়া কারখানা (২২ নভেম্বর, ২০০৬): একটি মাত্র বেরোনোর পথ এবং সেটি তালাবন্ধ থাকায় আটকে পড়েন প্রায় ৪০ জন শ্রমিক। তালা ভেঙে উদ্ধার করা হলেও গুরুতর দগ্ধ হয়ে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয় এবং ১৮ জন আহত হন।
  • নন্দরাম মার্কেট (১২ জানুয়ারি, ২০০৮): বড়বাজারের ১৩ তলা পাইকারি বাজারে লাগা আগুন প্রায় ১০০ ঘণ্টা (চার দিন) ধরে জ্বলেছিল। প্রাণহানি না হলেও শত শত দোকান ভস্মীভূত হয়।
  • স্টিফেন কোর্ট (২৩ মার্চ, ২০১০): পার্ক স্ট্রিটের ঐতিহাসিক এই বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডে জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ থাকায় ৪২ জন প্রাণ হারান।
  • আমরি (AMRI) হাসপাতাল (৯ ডিসেম্বর, ২০১১): ঢাকুরিয়ার বেসমেন্টের দাহ্য পদার্থ থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে ৯২ জন রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীর করুণ মৃত্যু হয়।
  • বাগড়ি মার্কেট (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮): বড়বাজারের ঘিঞ্জি পাইকারি বাজারে প্রায় ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে জ্বলা আগুনে শত শত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাই হয়ে যায়।
  • গড়িয়াহাট প্রাইম আর্কেড (১৯ জানুয়ারি, ২০১৯): রাস্তার হকারদের দোকান থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশের বহুতল শাড়ির দোকানে, নষ্ট হয় কোটি টাকার সম্পত্তি।
  • স্ট্র্যান্ড রোড এফআরআরবি বিল্ডিং (৮ মার্চ, ২০২১): পূর্ব রেলের কার্যালয়ের ১৩ তলায় লাগা আগুনে উদ্ধারকাজে গিয়ে লিফটে বিষাক্ত ধোঁয়ায় আটকে পড়ে ৯ জন (ফায়ার ফাইটার ও পুলিশ কর্মী) মারা যান।
  • আনন্দপুর নাজিরাবাদ (২৬ জানুয়ারি, ২০২৬): সাধারণতন্ত্র দিবসের ভোরে মোমো কারখানার গুদামে ভয়াবহ আগুনে আটকে পড়েন শ্রমিকেরা। দীর্ঘ তল্লাশিতে ১৮ জনের দেহাংশ উদ্ধার হয় এবং ২৭ জন নিখোঁজ হন।

বারংবার ঘটে যাওয়া এসব অগ্নিকাণ্ড প্রমাণ করে যে, উন্নত সুরক্ষাবিধি ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে সামান্য অবহেলাও শহরবাসীর জন্য কতটা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।