দয়ার ধর্ম বনাম পাথরের বিচার—কোথায় আজ মানবতার ঠিকানা?

The Death Penalty for Young Bangladeshi Men and Women in Saudi Arabia—and the Questions It Raises

বিশেষ প্রতিবেদন

যে ধর্মে শান্তি, ক্ষমা এবং দয়ার আলো ছড়ানোর কথা সবচেয়ে বেশি বলা হয়েছে, সেই ইসলামের পবিত্র ভূমিতেই যখন ভালোবাসার বা সম্পর্কের পরিণতি হয় চরম নৃশংসতায়, তখন সংবেদনশীল মানুষের বুক কেঁপে ওঠে। সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে মসজিদ চত্বরে এক বাংলাদেশি নারী-পুরুষের ওপর ‘তাজির’ আইনের নামে যেভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তা কেবল একটি বিচারিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মানবতা ও বিবেকের এক নিদারুণ অপমান। প্রশ্ন জাগে, যে ইসলাম ক্ষমার ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেই ধর্মের নামেই কি তবে আজ নিষ্ঠুরতার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে?

ইসলামের মূল ভিত্তি যেখানে প্রেম, ভ্রাতৃত্ব এবং মানুষের প্রতি অগাধ দয়া, সেখানে এই ধরনের কঠোরতা কোনোভাবেই সভ্য সমাজ মেনে নিতে পারে না। একে ইসলামী মৌলবাদের অন্ধ বাড়াবাড়ি ছাড়া আর কীইবা বলা চলে? অথচ বিশ্ব রাজনীতির নির্মম পরিহাস দেখুন—আজ যখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যপ্রান্তে ফিলিস্তিনের মাটিতে হাজার হাজার নিরীহ শিশু ও নারী নির্বিচারে ইসরায়েলি আগ্রাসনের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন, তখন তথাকথিত মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত সৌদি প্রশাসন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। পরাশক্তি আমেরিকা বা ইসরায়েলের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে এই অমানবিক রক্তপাতকে কার্যত মৌন সমর্থন জানানো হচ্ছে। তখন বিশ্ব জোড়া ‘ইসলামি ভ্রাতৃত্ব’-এর সেই চটকদার ডাক কোথায় হারিয়ে যায়? অথচ নিজের দেশের মাটিতে বিচারের নামে এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা চালিয়ে বিশ্বমঞ্চে ইসলামকে এক ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর রূপ দিতে তাদের একটুও বাধে না।

এই দ্বিমুখী নীতি ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের সরব হওয়া জরুরি। অতীতেও আমরা দেখেছি, সৌদি যুবরাজের নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলায় সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে কনস্যুলেটের ভেতরে কীভাবে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছিল। বিশ্বজুড়ে সাময়িক আলোড়ন উঠলেও শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার দাপটে সব ধামা চাপা পড়ে গেছে। সাধারণ মানুষের মনে আজ এই ধারণাই শক্ত হচ্ছে যে—ক্ষমতা আর তেলের জোরে সৌদি আরবে যেন সব অপরাধই মাপ!

এই ধারা যদি না বদলায়, তবে তা শুধু একটি দেশের বিচারব্যবস্থার ত্রুটি নয়, বরং তা সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিপ্রিয় মুসলমানের আত্মসম্মান ও বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ইসলামী মৌলবাদ ও উগ্রতার সাহস আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে। সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার। ধর্মের সঠিক উদার ও মানবিক রূপটিকে ফিরিয়ে আনার লড়াই আজ সময়ের দাবি, নতুবা অন্ধ মৌলবাদের এই করাল গ্রাসে হারিয়ে যাবে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও মানবতা।