বাংলায় ক্রমেই বাড়ছে ‘এনকাউন্টার সংস্কৃতি’? গাইঘাটা থেকে ধুলিয়ান— প্রশ্নের মুখে রাজ্য প্রশাসন

State administration faces questions over ‘encounters’ in Bengal

বিশেষ প্রতিবেদন

উত্তরপ্রদেশের (Uttar Pradesh) ‘যোগী মডেল’ বা পুলিশি এনকাউন্টারের ছায়া কি এবার আছড়ে পড়ল বাংলায়? গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে রাজ্যের দুটি প্রান্ত থেকে যেভাবে পুলিশের গুলিতে অপরাধে অভিযুক্তদের মৃত্যুর খবর সামনে এল, তাতে এই বিতর্ক এখন সব মহলেই তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই দিনে গাইঘাটা ও ধুলিয়ান— এবং তার আগে বারুইপুরের ঘটনা যুক্ত করলে, বাংলায় পুলিশের ভূমিকা ও বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

১. ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে জোড়া এনকাউন্টার

মঙ্গলবার রাজ্যবাসীর ঘুম ভেঙেছিল উত্তর ২৪ পরগনার গাইঘাটার মর্মান্তিক ঘটনা দিয়ে, আর দুপুর গড়াতে না গড়াতেই মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান থেকে এল আরও এক পুলিশি এনকাউন্টারের খবর।

  • গাইঘাটা ঘটনা: মঙ্গলবার ভোররাতে গাইঘাটায় এক ধর্ষণে অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য (Crime Scene Reconstruction) নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পুলিশের দাবি, সেই সময় অভিযুক্ত হঠাৎ এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। এরপর পুলিশের পাল্টা গুলিতে ওই যুবকের মৃত্যু হয়।
  • ধুলিয়ানের ঘটনা: ঠিক এর পরেই দুপুরে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে ঘটে অনুরূপ এক ঘটনা। মাস দুয়েক আগে সুজিত মণ্ডল নামে এক বিজেপি নেতাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ ছিল সামাউন শেখ নামের এক যুবকের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার সিআইডির বিশেষ তদন্তকারী দলের নেতৃত্বে সেই খুনের ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় ধুলিয়ান বাজার এলাকার একটি ভাড়াবাড়িতে এই এনকাউন্টার ঘটে। পুলিশের দাবি, এখানেও তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্ত পুলিশকর্মীর রিভলভার কেড়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং ধস্তাধস্তিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়।

২. বারুইপুর থেকে শুরু, ধারা অব্যাহত

এই তালিকায় নতুন সংযোজন কেবল গাইঘাটা বা ধুলিয়ান নয়। এর আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরেও একটি ধর্ষণের ঘটনায় ঠিক একইভাবে অপরাধের পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলা এই ধরনের ঘটনার মধ্যে একটি স্পষ্ট মিল খুঁজে পাচ্ছেন সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক মহল। প্রতি ক্ষেত্রেই চিত্রনাট্য প্রায় একই— ধর্ষন বা খুনের মতো গুরুতর অপরাধের পুনর্নির্মাণ, অভিযুক্তের পুলিশি অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা এবং পুলিশের গুলিতে তার মৃত্যু।

৩. সুজিত মণ্ডল খুন ও রাজনৈতিক তরজা

মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানের ঘটনায় নিহত সামাউন শেখ ছিল বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত। গত অগস্টে সামশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলা এলাকার বাসিন্দা সুজিতকে পশুর মাংস কাটার অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে খুনের অভিযোগ উঠেছিল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে যায়। তদন্তে পুলিশের প্রাথমিক গাফিলতির অভিযোগ উঠলেও, পরে মামলার গুরুত্ব বুঝে মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনার তদন্তভার সিআইডির হাতে তুলে দেন। সিআইডির এসপি তাপস মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল মঙ্গলবারই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যায় এবং মৃতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে। এর ঠিক পরপরই অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্যজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও চড়েছে।

৪. যোগী রাজ্যের ‘ইউপি মডেল’ বনাম বাংলার বাস্তবতা

উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারের জমানায় অপরাধ দমনে ‘বুলডোজার নীতি’ এবং ‘পুলিশি এনকাউন্টার’ অত্যন্ত পরিচিত চিত্র। বিরোধীরা বহুবার অভিযোগ করেছেন যে, আইনি বিচার প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে অপরাধীদের সরাসরি নিকেশ করার এই সংস্কৃতি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিপন্থী।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলায় একের পর এক এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন— তবে কি যোগী রাজ্যের সেই ‘এনকাউন্টার সংস্কৃতি’ বা ‘ইউপি মডেল’ এবার নীরবে প্রবেশ করছে বাংলায়? অপরাধীদের চরম শাস্তি হোক, এ নিয়ে সাধারণ মানুষের দ্বিমত না থাকলেও, বিচারালয়ের বিচার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে তদন্তের মাঝেই অভিযুক্তদের এভাবে গুলিতে মৃত্যুর ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকারের প্রশ্নগুলোকে তীব্রভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।