SIR Controversy
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য
তুলসী মঞ্চ, কন্ঠি, জপমালা, পশ্চিমমুখী আসন। সবাইকে বেঁধেছে ভোটের অধিকার শুন্য হাত। উত্তরের একদা ছিটমহল থেকে দক্ষিণের খাসমহল বিস্তৃত বঙ্গে এস আই আর এর অবদান। নিরালা চৈত্রের তপ্ত, শুস্ক হাওয়ায় অস্তিত্ব প্রমাণের মরিয়া দৌড়ে শামিল হেঁসেল সামলানো বধু, একমাত্র রোজগেরে জোয়ান, মদ্দা থেকে দাওয়া আগলানো বৃদ্ধ বৃদ্ধা। এ দরজা, সে দরজায় ছুটে ছুটে আটপৌরে জীবন গুলোয় এখন শুধু ক্লান্তি আর হতাশার বসত। যে মাটিতে কারো দিনাবসনের ছায়া, কারো জীবনে মধ্যাহ্নের ইশারা, কারো জীবনে নবীন কিশলয়ের স্পর্ধা, সেই মাটিতেই তাদের অ- নাগরিকের অসম্মান। প্রথমে ছিল অদম্য আশা। খসড়া তালিকা, যুক্তিগত অসঙ্গতি, ট্রাইব্যুনাল ঘষ্টানো পথ পেরিয়ে হতাশা আর ভয় গ্ৰাস করেছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিকে। নিম্নবিত্ত থেকে মোটামুটি স্বচ্ছল, জীবনগুলো দিন যাপনের টানা হেঁচড়া সয়ে নিয়ে চলছিল। হঠাৎ করেই জন্ম মাটিতে পরিচয় নিয়ে সন্দেহ, বাতিলের দমকা হাওয়া এসে কেমন যেন উদ্ভ্রান্ত করে দিয়েছে জীবনগুলোকে। ট্রাইব্যুনালের দরজার সামনে দিনমানের প্রচলিত কাজ ফেলে ভিড় করা মানুষগুলোর উপলব্ধি ভিটে, মাটির সঙ্গে নাড়ীর বাঁধনের থেকেও কাগজের জোর বেশি।
চৈত্র শেষের হাওয়ায় জীর্ণ হলুদ পাতার মতো দূরে আরও দূরে উড়ে যাচ্ছে হা- ক্লান্ত মানুষগুলোর জন্মভিটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ। উত্তরের ছিটমহল, মালদা, মুর্শিদাবাদ, দুই দিনাজপুর, বাগদা, বনগাঁ, কাকদ্বীপ, ভাঙল, নন্দীগ্রাম, ঝাড়গ্ৰাম, বঙ্গে মানচিত্রে ছড়িয়ে থাকা নাম। ভোটার তালিকায় ‘ ম্যাপড’ চিত্রে ঠাঁই না পেয়ে এঁকেছে নতুন এক মানচিত্র । যেখানে, নদী, পুকুর, জঙ্গল, বসতবাড়ি খেত খামার, মন্দির, মসজিদ সবকিছু নাম, পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু অসংখ্য মানুষ তাদের পরিচয় হারিয়ে বসে আছে। এই বাংলার জলে, হাওয়ায় বহু প্রাচীন বচন আজও ঘুরে বেড়ায়, তেমনই একটি হলো ‘ যতদিন বাঁচি, ততদিন শিখি’ । এ বাঁচা কেমন বাঁচা সেই প্রবল প্রশ্ন তাকে তুলে রেখে বলা যায় শিখছেন বটে মানুষগুলো। মতুয়া, সদগোপ, কুর্মি, মাহাতো, মাহিষ্য, রাজবংশী, মুসলমান। রাজ্যের অনগ্ৰসর সব সম্প্রদায় ই এতদিন দেখে এসেছেন ভোট এলেই প্রায় কোলে বসিয়ে মুখে ভাতের গ্ৰাস তুলে দিতে বাকি রেখেছে রাজনৈতিক দলগুলো। আর ভোটছুট হতেই ভোট যাদুর টানে তারা অদৃশ্য। যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা বা প্রার্থী সামনে পড়ে যান তাহলেও কোনো সদুত্তর নেই। একদা ছিটমহলের মশালডাঙা হস্তান্তরের হর্ষ উদযাপন হয়েছিল। স্বপ্ন ছড়িয়ে ছিল আজন্ম কাঙ্খিত পরিচয় লাভের।
খোদ ভারত সরকারের মন্ত্রক ছিটমহল বিনিময়ের পরে যারা ভারতে থাকবেন তাদের পরিচয় দেওয়ার আশা দেখিয়েছিল সিলমোহর সহ, সেই আশার আলোয় পথ চলে যে ৯২২ জন ভারতে এসেছিলেন বাংলাদেশের ছিটমহল থেকে তাঁদের মধ্যে একজন ওসমান গনি। সেই এসে জমি কিনে, বাড়ি করে বসবাস। আজ দেখছেন তাঁর নিজের পরিচয় নেই। ওই গ্ৰামেই লাগোয়া পোয়াতুরকুটির বধু মর্জিনা বিবির স্বামী, সন্তান, হেঁশেল সবই রয়েছে শুধু পরিচয়ের খাতাটা শুন্য হয়ে গিয়েছে। এই বাংলার অনেক গ্ৰাম রয়েছে দিনে – রাতে যার গায়ে লেগে থাকে কাঁটাতারের বাঁধন। তেমনই এক গ্ৰামের নাম ধর্মপুরিয়া। চৈত্রের দুপুরে তেতে ওঠা মেঠো রাস্তা, তপ্ত লতা- গুল্মে ঢাকা দিঘির পাশে ছাপোষা ঘরের দাওয়ায়, ইষৎ হেলে পড়া বাঁশের খুঁটি ধরে দাঁড়িয়েছিলেন ৭০টি বসন্ত পার করা নমিতা বিশ্বাস। গলায় কন্ঠি, কপালে চন্দনের তিলক। চোখে উদাস দৃষ্টি। বলছিলেন, মেয়েবেলার সেই শুরুতে বধু হয়ে প্রবেশ এই ভিটেতে। পোষ্য , সন্তান, উদ্ভিদ, প্রতিবেশী সবার গোচরেই তাঁর পরিচয় গভীরে পোক্ত। শুধু, ভোটার তালিকায় শুন্য। খাদে ডুবে যাওয়া গলা যখন কথা গুলো বলছিল তখন সাক্ষী শুধু মৌনি তাপস।
