কংসবধের পর এবার ‘কেষ্টবধ’? মমতার নৌকো ছেড়ে ঋতব্রতর স্টিমারে অনুব্রত!

Anubrata leaves Mamata’s boat for Ritabrata’s steamer.

কলকাতা: রাজনীতির ময়দানে চিরকালই খেলা হয়, তবে ২০২৬-এর এই মরশুমে যা খেলা হচ্ছে, তাকে ‘খেলা’ বললে কম বলা হবে—এ তো একেবারে মহাকাব্যিক থ্রিলার! আর সেই থ্রিলারের সবচেয়ে বড় ক্লাইম্যাক্সটি মঞ্চস্থ হলো বীরভূমে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা ‘খেরোর খাতা’র সবচেয়ে বিশ্বস্ত পাতা, বীরভূমের বেতাজ বাদশা ওরফে আমাদের সবার প্রিয় ‘কেষ্টদা’ অর্থাৎ অনুব্রত মণ্ডল শেষমেশ দিদির হাতটাই ছেড়ে দিলেন! না, তিনি হিমালয়ে যাননি, গিয়েছেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে। শুধু যাননি, একেবারে বীরভূমের জেলা সভাপতির তকমাটা পকেটে পুরে ফেলেছেন।

যাঁর মাথায় অক্সিজেন কম ঢোকে বলে দিদি স্নেহের পরশ বুলিয়েছিলেন, সেই কেষ্টদা যে শেষমেশ দিদির অক্সিজেন সিলিন্ডারটাই খুলে দিয়ে অন্য শিবিরে পাড়ি দেবেন, তা হয়তো কালীঘাটের চাণক্যরাও স্বপ্নে ভাবেননি!

আশিসের ঘটকালি আর কাজলের ‘দাদা বদল’

রাজনীতিতে প্রেম হোক বা দলবদল, একজন ঘটক তো লাগেই। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় নাকি এই হাইপ্রোফাইল দলবদলের নেপথ্যে আসল ‘ঘটকালি’ বা যোগসূত্রের কাজটা করেছেন। এদিকে কেষ্টদার এই ভোলবদলে বীরভূমের রাজনীতির আর এক দিকপাল, কাজল শেখের মুখটা দেখার মতো হয়েছে।

একসময় যিনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরমতম গুণগ্রাহী বলে বুক চাপড়াতেন, সেই কাজল শেখ কিন্তু আগেভাগেই ঋতব্রতর নৌকোয় চড়ে বসে আছেন। ‘দাদা’র হাত ধরে বীরভূম জেলা সভাধিপতির কুর্সিটা তো সামলাচ্ছেনই, সঙ্গে হাসন বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের টিকিট পেয়ে এখন তিনি খোদ বিধায়ক মশাই! দীর্ঘদিন জেড ক্যাটেগরির (Z-Category) রাজকীয় নিরাপত্তা ভোগ করা কাজলবাবুর সাথে কেষ্টদার ‘আদায়-কাঁচকলায়’ সম্পর্ক কারোর অজানা নয়। চড়াম চড়াম ঢাক বাজানো কেষ্ট আর কাজল শেখের এই আদায়-কাঁচকলা রসায়ন এবার ঋতব্রতর একই ছাতার তলায় কেমন জমে, সেটাই এখন দেখার। তবে নিন্দুকেরা বলছেন, “বিপদে পড়লে বাঘেও নাকি ঘাটে জল খায়, আর রাজনীতিকরা তো কোন ছার! সব পুরনো ঝগড়া ভুলে এখন সবাই ঋতব্রতর প্রমোদতরীর সওয়ারি।”

অক্সিজেন কম, কিন্তু হিসাব একদম পাকা!

অনুব্রত মণ্ডলের রাজনৈতিক জীবনটা বরাবরই রঙিন। ২০১৩ সালে যখন তিনি প্রকাশ্য জনসভায় পুলিশকে ‘বোম মারার নিদান’ দিয়েছিলেন, দিদি কিন্তু কানেই তোলেননি। উল্টে স্নেহের সুরে বলেছিলেন, “ও তো একটু চঞ্চল ছেলে, ওর মাথায় অক্সিজেন কম ঢোকে!” দিদির এই ‘অক্সিজেন থিওরি’র ওপর ভর করেই কেষ্টদা বীরভূমে রাজত্ব চালিয়েছেন।

গত বছর যখন বোলপুর থানার আইসি-কে ফোনে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করার অডিও ভাইরাল হলো, দিদি তখনও নির্বিকার, যেন কিছুই শোনেননি! কিন্তু এবার? মমতা-ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায় আসল রহস্যটা ফাঁস হয়েছে। তিনি ফিসফিস করে বলছেন, “কেষ্টর ওই দিকে যাওয়ার নেপথ্যে যেমন সিবিআই-ইডির মামলার খাঁড়া রয়েছে, তেমনই রয়েছে চরম সন্তানস্নেহ। কেষ্টদা চান না তাঁর আদরের মেয়েকে আর কোনোদিন জেলের ভাত খেতে হোক!” অর্থাৎ, নিজের অক্সিজেন কম থাকলেও, মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কেষ্টদার হিসাব কিন্তু একদম পাকা!

পানিহাটির ‘নির্মল’ হাওয়া আর শান্তনুর এন্ট্রি

খেলা শুধু বীরভূমে থামেনি, ছড়িয়েছে উত্তর ২৪ পরগনাতেও। আরজি কর মামলায় সিবিআইয়ের জেরা সামলে পানিহাটির প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষ মহাশয় বেশ কিছুদিন ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ বা অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিধাতা বাম অলিন্দে হাসলেন! সম্প্রতি আবার এক লটারি মামলায় তাঁর নাম জড়িয়ে গেল, এমনকি তাঁর এক অতি ঘনিষ্ঠজন গ্রেপ্তারও হলেন। ব্যাস! ইডি-সিবিআইয়ের নাম শুনলেই যে ওষুধ কাজ করে, তা এখানেও করল। শনিবারই নির্মলবাবুকে দেখা গেল মাথা নিচু করে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের বৈঠকে হাজির হতে।

তবে ট্র্যাজেডি হলো অন্য জায়গায়। নির্মলবাবুর পুত্র, তীর্থঙ্কর ঘোষ, যিনি এবার পানিহাটির প্রার্থী হয়েছেন, তিনি কিন্তু খাতায়-কলমে এখনও কালীঘাটের আসল তৃণমূলেরই অংশ! মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে যুব সংগঠনের বড় দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ, একই বাড়িতে বাপ একদিকে তো ব্যাটা অন্যদিকে! একেই বোধহয় বলে ‘পারিবারিক ব্যালেন্স শিট’।

এদিকে ঋতব্রত শিবির নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করে যখন জেলা সভাপতিদের তালিকা ঘোষণা করল, তখনই এই পাহাড়প্রমাণ চমকটা সামনে এল। অনুব্রত মণ্ডল যখন বীরভূমের জেলা সভাপতি হচ্ছেন, তখন তিনি সশরীরে বীরভূমেই হাজির। আর এই গোটা ডামাডোলের মধ্যে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের রাজ্য কমিটিতে সগৌরবে এন্ট্রি নিলেন শান্তনু সেন।

শেষ কথা: রাজনীতির এই মিউজিক্যাল চেয়ারে শেষ হাসি কে হাসবে তা সময়ই বলবে। তবে আপাতত দিদির ‘স্নেহের কেষ্ট’ এখন ঋতব্রতর ‘তুরুপের তাস’। কালীঘাটের অন্দরমহলে এখন একটাই গুনগুন—”মাথায় অক্সিজেন কম থাকতে পারে দিদি, কিন্তু দলবদলের টাইমিংটা কেষ্টদা একদম পারফেক্ট করেছে!