80 Years of India’s Independence
বিশেষ প্রতিবেদন
আজাদির আশি বছর কেবল আলোকসজ্জা আর জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপনের নয়; এ হলো আত্মপর্যালোচনা ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক ঐতিহাসিক ক্ষণ। যে স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা, আটটি দশক পেরিয়ে এসে সেই স্বপ্নের আকাশে আজ যেমন প্রাপ্তির উজ্জ্বল আলো আছে, তেমনই কালো মেঘের গভীর ছায়াও ঘিরে ধরেছে আমাদের সমাজ ও রাজনীতিকে।
একদিকে যেমন রয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ও মহাকাশ জয়ের গল্প, অন্যদিকে তেমনই আজ গ্রাস করছে এক গভীর হতাশা। ধর্মের নামে রাজনীতি আজ এক চরম ও আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোটের সমীকরণে জয়ী হতে সচেতনভাবে ধর্মে ধর্মে বিভেদের আগুন উসকে দেওয়া হচ্ছে, যা শতবর্ষের সামাজিক বুনন ও সম্প্রীতিকে ক্ষতবিক্ষত করছে। নাগরিকত্ব কাড়াকাড়ি কিংবা মানুষকে নিজের দেশে পরবাসী বা বেনাগরিক করে তোলার নানা রাজনৈতিক কৌশলে আজ মানুষ দিশেহারা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের ভরসা ছিল, সেই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও আজ গম্ভীর প্রশ্ন উঠছে।
শিক্ষা থেকে সংস্কৃতি—সর্বত্র আজ একতরফা বৈচিত্র্যহীন আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। রাজনীতির মূলধারা থেকে আদর্শের লড়াই আজ বিদায় নিয়েছে; সেখানে জায়গা করে নিয়েছে কদর্য ব্যক্তিআক্রমণ, অশ্রদ্ধা ও কাদা ছোড়াছুড়ি। সমাজের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিরা রাজনীতির ময়দানে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা—প্রতিটি স্তম্ভেই আজ দুর্নীতির কালো ছায়া এবং মানবিক সংবেদনশীলতার চরম অভাব স্পষ্ট। কোনো নাগরিক যদি সরকারের ভুল নীতির বিরুদ্ধে বা নিজের মৌলিক অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তবেই তার কপালে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে ‘দেশবিরোধী’র তকমা।
কিন্তু ইতিহাসের নিয়মই হলো, অন্ধকারের তীব্রতা যখন বাড়ে, তখনই ভোরের আলো ফোটার সূচনা হয়। যখন শাসক ও ব্যবস্থার চাপে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, তখনই ঘুরে দাঁড়িয়েছে এ দেশের যুবসমাজ।
আজ পথে নেমেছে কোনো রাজনৈতিক পতাকাবিহীন নতুন প্রজন্ম—আমাদের ‘জেন জি’ এবং ‘জেন আলফা’। তাদের প্রতিবাদের ভাষা, তাদের চোখে মুখে কোনো জাত-পাত বা ধর্মের বিদ্বেষ নেই। সেখানে আছে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, এবং নিশ্চিত কর্মসংস্থানের ন্যায্য দাবি। তারা ধর্মের নামে রাজনীতি বা বিভাজনের এজেন্ডাকে প্রত্যাখ্যান করে রুটি, রুজি আর অধিকারের প্রশ্নগুলোকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনছে। শাসক বা ব্যবস্থার রক্তচক্ষুকে ভয় না পেয়ে তরুণ প্রজন্মের এই নির্ভীক কণ্ঠস্বর আজ সমগ্র আমজনতার সুপ্ত বিবেককে নাড়া দিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—“ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।” আজ সত্যিই এই নতুন প্রজন্মই আমাদের সেই ‘সবুজ’। জরাগ্রস্ত, বিভক্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজকে ঘা মেরে বাঁচানোর দায়িত্ব আজ তারা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। তাদের এই সোচ্চার প্রতিবাদই স্বাধীনতার আশি বছরে এসে এক নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
এই তরুণরাই প্রমাণ করছে, ভারত মানে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা বা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম নয়; ভারত মানে তার বৈচিত্র্য, মানবিকতা এবং সত্যের পথ। জরা ও গ্লানি পেছনে ফেলে এ দেশের মানুষ আবার নতুন করে জেগে উঠবে, নতুন করে বেঁচে উঠবে—তরুণদের এই নতুন লড়াইয়ের হাত ধরেই ঘুরে দাঁড়াবে আমাদের প্রিয় ভারতবর্ষ।
জয় হিন্দ। জয় ভারত।
