প্রতীকি ছবি
Jadavpur University: A Liberated Zone of Protest
বিশেষ প্রতিবেদন
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়—কেবল কতগুলো ইটের দেওয়াল বা প্রশাসনিক ভবনের সমষ্টি নয়, এটি মুক্ত চিন্তা, প্রতিরোধ আর অধিকার আদায়ের এক জীবন্ত প্রতীক। বাম জমানা থেকে শুরু করে তৃণমূলের শাসনকাল, আর আজকের গেরুয়া শিবিরের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা—সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে, কিন্তু যাদবপুরের রক্তে মিশে থাকা ‘প্রতিবাদের সুর’ বিন্দুমাত্র ফিকে হয়নি। স্লোগান, গিটার আর লাল-গেরুয়া-নীল পতাকার লড়াইয়ে বারবার উত্তাল হয়েছে এই ঐতিহ্যবাহী ক্যাম্পাস।
বাম শাসনকাল: মতাদর্শের সংঘাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার
- ১৯৭০-৮০-র দশক (নকশালবাড়ি আন্দোলনের রেশ ও ছাত্র আন্দোলন): সত্তরের দশকে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব যাদবপুরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌঁছে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ রাজ্য সরকারের যেকোনো অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতো।
- ২০০৫-২০০৬ (প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ও ঘেরাও সংস্কৃতি): তৎকালীন বাম সরকারের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ছাত্র আন্দোলন চরম আকার নেয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর দীর্ঘ আন্দোলন ও উপাচার্যকে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘেরাও করার সংস্কৃতি এখান থেকেই আরো তীব্র রূপ পায়।
তৃণমূলের শাসনকাল: ‘হোক কলরব’ থেকে সিসিটিভি বিতর্ক
- ২০১৪ (ঐতিহাসিক ‘হোক কলরব’ আন্দোলন): যাদবপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও আবেগঘন অধ্যায়। ক্যাম্পাসে এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির প্রতিবাদে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের ওপর রাতে পুলিশ ডেকে চরম লাঠিচার্জ করা হয়। এর প্রতিবাদে জন্ম নেয় ‘হোক কলরব’ আন্দোলন। পড়ুয়াদের সেই প্রতিবাদের ঢেউ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়ে পৌঁছায় রাজভবন পর্যন্ত। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও প্রাক্তনীরা রাজপথে নেমে আসেন, যা তৎকালীন উপাচার্যের পদত্যাগে বাধ্য করে।
- ২০১৯ (বাবুল সুপ্রিয় বিতর্ক ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত): কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় ক্যাম্পাসে এলে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর বাধার মুখে পড়েন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাজ্যপাল নিজে গিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে উদ্ধার করেন, যার ফলে রাজভবন বনাম যাদবপুর সংঘাত নতুন মাত্রা পায়।
- ২০২৩ (প্রথম বর্ষের ছাত্রের মৃত্যু ও র্যাগিং বিরোধী ঝড়): হোস্টেলে প্রথম বর্ষের এক ছাত্রের রহস্যমৃত্যুর পর মূলস্রোতের ছাত্র রাজনীতি ও র্যাগিং কালচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো ও নিরাপত্তা জোরদার করা নিয়ে প্রশাসন বনাম পড়ুয়াদের তুমুল টানাটানি শুরু হয়।
সাম্প্রতিক সময়: জাতীয়তাবাদী বনাম বাম রাজনীতির রেষারেষি
- ২০২৪–২০২৬ (জিবি মিটিং বিতর্ক ও ঐতিহ্যবাহী লোগো ভাঙচুর): বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়ন না থাকা সত্ত্বেও জিবি (GB) মিটিং ডাকা নিয়ে এসএফআই এবং এবিভিপির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। ৪ নম্বর গেটের তালা ভাঙার চেষ্টা এবং পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির মাঝেই ক্ষতি হয় শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর তৈরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী ‘শতদল’ লোগোটি।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনের চেহারা সময়ের সাথে বদলেছে—কখনো তা পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণ, কখনো প্রাতিষ্ঠানিক র্যাগিংয়ের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার, আবার কখনো মতাদর্শগত আধিপত্যের লড়াই। তবে প্রতিটি আন্দোলনের মূল সুরটি এক: শাসন বা শোষণের মুখে মাথা নত না করা। যতবারই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার ও বাকস্বাধীনতায় আঘাত এসেছে, ততবারই মিছিলের গর্জন প্রমাণ করেছে—যাদবপুর থামতে শেখেেনি।
