হিমালয়ে ভয়াবহ বিপর্যয়: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে বন্যায় মৃত ৬৭৫, বিদেশি সহ উদ্ধার কয়েক হাজার

Nepal Flood Latest Situation

বিশেষ প্রতিবেদন

নেপাল এবং চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হিমবাহ ধসের জেরে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় এ পর্যন্ত অন্তত ৬৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিব্বত অংশে চিনের রাষ্ট্রীয় মাধ্যম ৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে। চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান। নেপাল পুলিশ ও সেনাবাহিনীর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দল এ পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে।

উদ্ধার অভিযান ও উদ্ধারকৃতদের পরিসংখ্যান নেপাল সেনাবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকারী দলগুলো এখন পর্যন্ত ২,৪৬৫ জনকে উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ১৬৩ জন বিদেশী নাগরিক রয়েছেন। উদ্ধার হওয়া বিদেশীদের তালিকায় রয়েছে:

  • ভারত: ১১৩ জন
  • চীন: ২৬ জন
  • দক্ষিণ কোরিয়া: ১৫ জন
  • জার্মানি: ৪ জন
  • ইতালি ও আমেরিকা: ২ জন করে
  • ওমান: ১ জন

এছাড়া রসুয়া ও ত্রিশূলি অঞ্চলের একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে (টার্নেলে) আটকে পড়া ১৯১ জন শ্রমিককেও নিরাপদে বের করে আনা হয়েছে।

ত্রিশূলী প্রকল্পে অলৌকিক বাঁচার যুদ্ধ গত বুধবার (২৬ আগস্ট) জল, কাদা ও পাথরের এক বিধ্বংসী স্রোত মধ্য নেপালের বহু গ্রাম, সড়ক, সেতু ও যানবাহন ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই এলাকার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো। ‘ত্রিশূলী ৩এ’ (Trishuli 3A) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে এখনও ১০০ জনেরও বেশি মানুষ আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, শনিবার সকাল থেকেই ভারী ড্রিলিং যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সুড়ঙ্গের মুখ পরিষ্কার করার কাজ জোরকদমে চলছে।

নতুন করে বৃষ্টির পূর্বাভাস ও হাই অ্যালার্ট উদ্ধার কাজের মাঝেই তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। নেপালের আবহাওয়া দপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, শনিবার বন্যা দুর্গত এলাকায় নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত ও বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড় হতে পারে। এতে ব্যাহত হতে পারে চপার ও ডিলিং অপারেশন। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খেনাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, পুরো পরিস্থিতির ওপর প্রতি মুহূর্তে নজর রাখা হচ্ছে এবং গোটা দেশকে “হাই অ্যালার্ট”-এ রাখা হয়েছে।

হ্রদের জল কমার স্বস্তি বন্যার পরপরই হিমবাহ ধসের ফলে দুই নদীর মোহনায় এক বিপজ্জনক কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল, যা ভেঙে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে চিনা কর্তৃপক্ষের মতে, সেই আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। চীনের ওয়াটার রিসোর্সেস মিনিস্ট্রি উপগ্রহ চিত্রের বিবরণ দিয়ে জানিয়েছে:

  • স্যাটেলাইট চিত্র অনুযায়ী, দুটি নদীর সংযোগস্থলে তৈরি হওয়া হ্রদটি থেকে ধীরে ধীরে জল বেরিয়ে যাচ্ছে।
  • নদীর মোহনায় গঠিত হ্রদটির আয়তন শনিবার সকালে কমে ৯৯,০০০ বর্গমিটারে নেমে এসেছে (যা প্রায় ১৪টি ফুটবল মাঠের সমান)। বৃহস্পতিবার এটি আরও ২১,০০০ বর্গমিটার বড় ছিল।

তবে এই হ্রদের নিচে ১২০,০০০ বর্গমিটার আয়তনের আরেকটি জলভাগের সন্ধান পেয়েছেন ভূতাত্ত্বিকরা, যার গভীরতা সম্পর্কে এখনও স্পষ্ট তথ্য মেলেনি।

ভারতের নজরদারি ও সীমান্ত সতর্কতা নেপালের এই বিপর্যয়ের পর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতও তাদের সীমান্ত সংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে নজরদারি বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তরাখণ্ডের রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মদন কৌশিক জানিয়েছেন, “নেপালের সাথে আমাদের দীর্ঘ সীমান্ত এবং ভৌগোলিক সাদৃশ্য রয়েছে। আমরা সব হিমবাহ এবং হিমবাহজাত হ্রদগুলোর ওপর ২৪ ঘণ্টা নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছি।” সীমান্ত অঞ্চলে যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে সেনাসদস্যদের।