israel-election-results-netanyahu-coalition-deadlock
৯৩ শতাংশ ভোট গণনার পরও স্পষ্ট নয় সরকার গঠনের ছবি। বিরোধী শিবিরের ঝুলিতে ৪৮ আসন, আরব দলগুলির সম্মিলিত আসন ১৯। ভোটে কারচুপি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক।
ইজরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোট গণনার পর প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন শিবির ৫৩টি আসন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ৪৮। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলি সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে প্রাথমিক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।ইজরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে কোনও শিবিরই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছতে না পারায় জোট গঠনের অঙ্ক এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাঁচ লক্ষেরও বেশি বিশেষ ব্যালটের দিকে নজর
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে পাঁচ লক্ষেরও বেশি বিশেষ ব্যালট। এই ভোটগুলির মধ্যে রয়েছে সেনাকর্মী, বিদেশে কর্মরত ইজরায়েলি প্রতিনিধি, বন্দি এবং নির্দিষ্ট কারণে নিজেদের নথিভুক্ত ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোট দেওয়া নাগরিকদের ব্যালট।এই বিশেষ ভোট ‘ডাবল এনভেলপ’ বা দ্বিস্তরীয় খামে জমা দেওয়া ব্যালট হিসেবে পরিচিত। বৃহস্পতিবার এই ভোট গণনার কাজ শুরু হয়েছে। ফলে আসনসংখ্যার প্রাথমিক হিসাব বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ভোটকেন্দ্রগুলির গণনাও সম্পূর্ণ হয়নি। মোট ১২,০১৮টি সাধারণ ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১১,৭১২টির ফল প্রক্রিয়াকরণের কথা জানানো হয়েছে। বাকি কেন্দ্রগুলির ভোট যাচাইয়ের কাজ চলছে।
বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে। ইজরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের উপপ্রধান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ বৃহস্পতিবার দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেটের প্রধান ডেভিড জিনিকে একটি চিঠি পাঠিয়ে নির্বাচনে বিদেশি শক্তির সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের অভিযোগ খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিদেশ থেকে অর্থ জোগান এবং ভোট কেনার সম্ভাবনা। তবে এই অভিযোগগুলি এখনও তদন্তসাপেক্ষ; এগুলিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার অবকাশ নেই।প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দল লিকুদও আরব দলগুলির বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, কয়েকটি আরব অধ্যুষিত ভোটকেন্দ্রে ঘুষ, ভয় দেখানো, হিংসা, জাল নথি ব্যবহার এবং একাধিকবার ভোট দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই অভিযোগের তদন্ত চেয়ে পুলিশ, শিন বেট এবং নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি।
লিকুদের তরফে অভিযোগের সমর্থনে একাধিক সাক্ষ্য ও নথি জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। অন্যদিকে, রা’আম দলের বিরুদ্ধে ভোট কেনাবেচার অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। দলটি অবশ্য অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আসন নিয়ে টানাপড়েন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের
প্রাথমিক ফলাফলে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলির আসনসংখ্যা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, রা’আম দলের আসনসংখ্যা সাত থেকে বেড়ে আট হতে পারে, অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের আসনসংখ্যা ১২ থেকে কমে ১১ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।দলগুলির মধ্যে অতিরিক্ত ভোটের আসন বণ্টন সংক্রান্ত চুক্তির কারণে শেষ আসনটি নিয়ে বিশেষ নজর রয়েছে। ইজরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিতর্কিত ১৯তম আসনটি জয়েন্ট লিস্টের পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ওই আসন পেতে রা’আম প্রায় ১,২০০ ভোটে পিছিয়ে রয়েছে বলে দ্য টাইমস অব ইজরায়েল-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আরব দলগুলিকে নিয়ে বিরোধীদের অবস্থান
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে বিরোধী শিবির আরব দলগুলির সমর্থন নেবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে। ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান বলেছেন, রা’আমকে পরবর্তী সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে নীতিগত বাধা থাকা উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য, অতীতে নেতানিয়াহুও রা’আম নেতা মনসুর আব্বাসের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন।
অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির একটি জায়নবাদী সরকার গঠনের পক্ষে এবং আরব দলগুলির সঙ্গে জোটে যাওয়ার বিষয়ে অনীহা দেখিয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।বালাদ দলের নেতা সামি আবু শেহাদেহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির এই অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, আরব দলগুলিকে সরকার গঠনের আলোচনার বাইরে রাখার প্রবণতা বৈষম্যমূলক। তাঁর বক্তব্য, ইজরায়েলের আরব নাগরিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
সরকার গঠন না হলে কি ফের নির্বাচন?
ইজরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। কোনও দল বা জোট এই সংখ্যা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা ও আলোচনা প্রয়োজন হয়। এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর শিবির ৫৩টি এবং বিরোধী শিবির ৪৮টি আসন পেতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব ইঙ্গিত করছে। ফলে আরব দলগুলির অবস্থান এবং ছোট দলগুলির সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।কোনও নেতা সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে ইজরায়েলে ফের নির্বাচনের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
৭৭.৭ শতাংশ ভোটদান
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটদানের হার ছিল প্রায় ৭৭.৭ শতাংশ। ভোট দেওয়ার যোগ্য নাগরিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩.৩ লক্ষ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই ইজরায়েলের প্রথম সাধারণ নির্বাচন।চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে বিশেষ ব্যালট গণনা, ভোট যাচাই এবং আসন বণ্টনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে। এরপর ইজরায়েলের রাষ্ট্রপতি আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলির নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের সম্ভাবনা যাচাই করবেন। সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া প্রার্থীকে জোট গঠনের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, ইজরায়েলের নির্বাচনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আরব দলগুলির সমর্থন ছাড়া কি নেতানিয়াহু-বিরোধী শিবির সরকার গড়তে পারবে, নাকি সংখ্যার অঙ্কে ফের ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ তৈরি হবে নেতানিয়াহুর? বিশেষ ব্যালটের গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই উত্তর স্পষ্ট নয়।
