মনমোহন সিংয়ের সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার না করলে সিপিএমের এই হাল হতো না

লেখক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

১৯৯১ সালে মনমোহন সিং এর শিল্প নীতি দেশকে আর্থিক বৃদ্ধির পথ দেখিয়েছিল। বর্তমান ভূ – রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতকে ভারসাম্যের কূটনীতিতে প্রতিষ্ঠা করেছিল তাঁর প্রধান মন্ত্রীত্ব কালের বিদেশনীতি। শরিক নির্ভর সরকার পড়ে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েও আমেরিকার সঙ্গে ভারতের অসামরিক পরমাণু চুক্তি করার পিছনে মনমোহনের দৃঢ় অবস্থানের কথা। গত দু দশকে ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক যে জায়গায় পৌঁচেছে তার ভিত গড়ে ছিল মনমোহনের সেদিনের সিদ্ধান্ত। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সশ্রদ্ধ স্মৃতিচারণ শুধু কূটনীতি বা অর্থনীতির পরিসরে ই আটকে থাকেনি, দলমত নির্বিশেষে যে রাজনীতিক রা মনমোহনের কাছাকাছি হয়েছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই সেই মুহূর্ত গুলিকে স্মরণ করেছেন। এই ক্ষেত্রে মনমোহনের স্মৃতি চারণ করে সিপিএম এর রাজ্য সভার সাংসদ জন ব্রিটাশ জানিয়েছেন ২০২১ সালে প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়। ব্রিটাশ সিপিএম সাংসদ জানার পরে মনমোহন সেদিন বলেছিলেন, ” UPA-I is the role model for any government”. বামপন্থার সামনে বিজেপির মতো দক্ষিণ পন্থি দলের বিপদ কতটা তা সেদিন অনুমান করেছিলেন জ্যোতি বসু ও হর কিষন সিং সুরজিত রা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে অর্থনীতি, শিল্পনীতি ও রাজনীতির মানদণ্ডে কংগ্রেস কেই প্রধান শত্রু চিহ্নিত করেছিল বামপন্থী রা। পশ্চিমবঙ্গ , কেরল ও ত্রিপুরায় রাজনৈতিক দ্বন্দে কংগ্রেস ও বাম দুপক্ষের ই রক্ত ঝরেছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০০৪ এর লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থীরা যে ৬৩টি আসন জিতেছিল তার অধিকাংশই প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেস কে হারিয়ে। তবু, সেদিন ‘সাম্প্রদায়িক বিপদ ‘ কেই প্রধান বিপদ হিসেবে চিহ্নিত করে কংগ্রেস সরকার কে সমর্থন দিয়েছিল বামেরা। আর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রজ্ঞা এবং পরম সহিষ্ণুতা দিয়ে সরকারকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মনমোহন। মনমোহন বিশ্বাস করতেন ধনতন্ত্রের পথেই সমৃদ্ধি গড়াও অসাম্য দূর করা সম্ভব। আর বামপন্থী রা তার উল্টো পথে এই লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় বলে বিশ্বাস করে। নয়ের দশক থেকে যত শরিক নির্ভর সরকার হয়েছে তাদের সঙ্গী ছিল অস্থিরতা। অথচ, সেদিক থেকে ও উজ্জ্বল ব্যতিক্রম UPA-I সরকার। দুই বিপরীত মতাদর্শের রাজনৈতিক শক্তি কে নিয়ে মনমোহন সেদিন যে পথ দেখিয়ে ছিলেন তা অবশ্য ই role model । ২০০৬ সালে মনমোহন নীতির ফলে আর্থিক ক্ষেত্রে বিশ্বে ভারতের অবস্থান বোঝা গিয়েছিল ২০০৬ সালে ডাভোসে world economic forum এর বার্ষিক সম্মেলনে। সেদিন ভারত ই ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বল গন্তব্য। ভারতীয় শিল্পপতিরা উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি সমান মর্যাদা নিয়ে উপস্থিত ছিলেন। এমন কি ডাভোসের রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলোতে ভারতীয় খানা এবং বলিউডি সঙ্গীতের মুর্ছনা ছড়িয়ে পড়েছিল। আবার, অন্যদিকে এই সময়ে ই বামেদের চাহিদা মেনে একশ দিনের কাজ আর টি আই, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষার অধিকার ও আদিবাসী দের অধিকার সংক্রান্ত আইন লাগু হয়েছিল। তবে ভারসাম্যের প্রেক্ষাপটে ও দুপক্ষের নীতি গত পার্থক্য চরমে পৌঁছয় আমেরিকার সঙ্গে অসামরিক পরমাণু চুক্তির প্রশ্নে। এই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে বামেরা সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেয়। পরবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেস নেতৃত্বে শরিকি সরকার গঠিত হয়। কিন্তু সেই সরকার একরাশ দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে বিদায় নেয়। ২০২৪ পর্যন্ত কংগ্রেসের সাংসদ সংখ্যা ১০০ স্পর্শ করতে পারে নি। অন্যদিকে বামেরা আজ রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর যে বিজেপি কে রুখতে দুই বিপরীত মতাদর্শের দল ‘দেশের স্বার্থে ‘ এক হয়েছিল সেই বিজেপি আজ কেন্দ্রে এবং ১৪টির বেশি রাজ্যে ক্ষমতাসীন।