বাংলায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ শুধুই প্রচার না বাস্তব সমস্যা আসল সত্যি জানুন

 

Paścimabaṅgē rōhiṅgā anuprabēśa samasyā

মনিরুল হোসেন, সাংবাদিক

আমাদের দেশে নাকি রোহিঙ্গা মুসলমানে ভরে গেছে। বিশেষ করে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারিরসহ বাংলার বিজেপি নেতাদের দাবী পশ্চিমবঙ্গে দেড় কোটি অবৈধ রোহিঙ্গা মুসলমান বাস করছেন। তাদের খুঁজে সীমান্তের ওপারে ছুড়ে ফেলায় বিজেপির লক্ষ্য। স্বাভাবিক ভাবে আমাদের দৈনন্দিন বাজরি রাজনীতির অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা মুসলমান। ২০২৬ নির্বাচনে বাজার গরম করবে এই বাংলায় ঢালাও রোঙ্গিঙ্গার আগমণ। তাই রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বিস্তারিত ও বাস্তব অবস্থা তুলে ধরা খুব জরুরী।

আসুন প্রথমে দেখে নেওয়া যাক কারা এই রোহিঙ্গা ।

রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে যে, সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটিজাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।

 পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশের ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। অষ্টম শতাব্দীতে, আরবের বাসিন্দারা আসার সময় থেকে আরাকানে (মিয়ানমার) মুসলমানদের বসবাস শুরু হয়। এই অঞ্চলের বসবাসরত মুসলিম জনপদই পরবর্তীকালে রোহিঙ্গা নামে পরিচিতি লাভ করে। রাখাইনে প্রধানত দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস মগ ও রোহিঙ্গা। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।

 রোহিঙ্গারা অধিকাংশই ইসলাম ধর্মের অনুসারি। তবে কিছু সংখ্যক হিন্দু ধর্মের অনুসারিও রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোসাঙ্গ স্বাধীনরাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ-ভূখণ্ড। তখন তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এই ভূলের মাসুল হিসাবে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি, মিয়ানমার ব্রিটিশ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। সেসময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। কিন্তু ১৯৬২ সালে, জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগ শুরু হয়। সামরিকজান্তা রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার নিপীড়নের শিকার হতে হয়। হত্যা-ধর্ষণ ছিল নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ পর্যন্ত বন্ধ করা হয়। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে সরকারি খাতায় নাম তোলা হত না।  

মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ‘কালা’ নামে পরিচিত। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এই ঘৃণা আরও বাড়িয়ে দেয়। মুসলমানরা ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিল এবং অনেক বৌদ্ধ জাপানিদের সমর্থন করেছিল। ১৯৪৮ সালে মায়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর, মুসলিমরা সমান অধিকারের জন্য লড়াই করেছিল কিন্তু পরাজিত হয়, সেইসাথে তাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন আরও দৃঢ় করে।

১৯৬২ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর, রোহিঙ্গাদের জন্য পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। সমস্ত নাগরিকদের জাতীয় নিবন্ধন কার্ড পেতে বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের শুধুমাত্র বিদেশী পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল, যা তাদের চাকরি এবং শিক্ষার সুযোগ সীমিত করেছিল।

১৯৮২ সালে, মিয়ানমার সরকার একটি নতুন নাগরিকত্ব আইন পাস করে, যা কার্যকরভাবে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীন করে। আইনের অধীনে, রোহিঙ্গাদের দেশের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর একটি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে স্থানান্তরের প্রথম ঘটনা ঘটে ১৯৭৮ সালের দিকে। রোহিঙ্গারা ১৯৭৮, ১৯৯১-১৯৯২, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৬ এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালে সামরিক নির্যাতন এবং দমনের সম্মুখীন হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তের প্রতিবেদন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের ভিতরে অতি-জাতীয়তাবাদী বৌদ্ধদের দ্বারা ঘৃণা এবং ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার শিকার হচ্ছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালে ব্যাপক হিংসা শুরু হওয়ার পর ১০ লাখেরও বেশি মানুষ যাদের অর্ধেক শিশু- বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল।ভারত-মায়ানমার সীমান্তের সবথেকে বেশি এলাকা অরুণাচলপ্রদেশেরই অন্তর্গত। সব মিলিয়ে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৫২০ কিলোমিটার। এছাড়া, মিজোরাম, মণিপুর এবং নাগাল্যান্ডে এই সীমান্তের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে – ৫১০ কিলোমিটার, ৩৯৮ কিলোমিটার এবং ২১৫ কিলোমিটার। জাতিদাঙ্গায় বিধ্বস্ত হয়ে আছে ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমার। অভিযোগ, এর জেরে ভারতে মায়ানমার থেকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বাড়ছে।

এই অবস্থায় ভারতের জন্য দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত ‘ফ্রি মুভমেন্ট রিজিম’ (এফএমআর) অনুসারে, ভারত ও মায়ানমার – দুই দেশের নাগরিকরা কোনওরকম নথি ছাড়াই সীমান্ত পার করে অন্য দেশের ভূখণ্ডে সীমান্ত থেকে ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় অবাধে যাতায়াত করতে পারেন।এখনো পর্যন্ত এই নির্দেশিকা বাতিল করা হয়নি।

স্বাভাবিক ভাবে বাংলায় রোহিঙ্গা ভরে গেছে এটা নেহাতই অমূলক বলে মনে করেছেন রাজনৈতিক বি্শ্লেষকরা।সেদিক থেকে অরুনাচল প্রদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের সংখ্যা সব থেকে বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু এতদিন পর্যন্ত অরুনাচলে এই সমস্যার কথা শোনা যায়নি। সে ছাড়িয়ে বাংলায় যে ভাবে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ নিয়ে শোরগোল তোলা হচ্ছে তার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।