২০২৬ বাংলার বিধানসভা ভোট বাঙালির ঐতিহ্য পরীক্ষার নির্বাচন

West Bengal Assembly Election 2026

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য , বিশিষ্ট সাংবাদিক

ভোটের দিন ঘোষণা হয়ে গেল। যদিও রাজ্যের ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ ভোট দিতে পারবেন কিনা তা এখনও অনিশ্চিত । SIR এর কারণে তাদের নাম বিচারপতিদের আতস কাচের নীচে রয়েছে। শুধু এই দিক থেকে নয়, আরও কয়েকটি দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের ভোট এবার অনেকটাই আলাদা। অথবা বলা যায় অতীতের ভোট মুখি বাংলায় যা দেখা যায় নি এবার তা দেখা যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেমন, সাম্প্রদায়িক পরিচিতির আধারে ভোট। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে বাম ও কংগ্রেস ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে। প্রকৃতিতে যেমন শূণ্যস্থান পড়ে থাকে না তেমনই প্রকৃতির সন্তান মানুষের সমাজেও শূণ্যস্থান পড়ে থাকে না। যে দলের জন্ম, বেড়ে ওঠা, সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অস্তিত্ব বিস্তারের সঙ্গে বাংলার কোনও যোগ নেই সেই বিজেপি ই এই নিয়মে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার আসনের লড়াইতে প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে বড় সাফল্য পাওয়ার পর থেকেই বিজেপি বাংলা দখলের জন্য বিভিন্ন নকশা তৈরি করতে থাকে। এই নকশাগুলির প্রধান উপাদান হলো ধর্মীয় বিভাজন এবং দলের গায় বাঙালিত্বের নামাবলি চাপানোর প্রানপন প্রয়াস। ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনের আগে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙ্গা থেকে ২০২৬ সালের ভোটের আগে ” বঙ্কিম’দার মহিমা কীর্তন ব্যর্থ প্রয়াসকে একই সূত্রে গেঁথেছে ।তবে বাঙালি -বীক্ষনে লোক হাসালেও ধর্মীয় বিভাজনের ক্ষেত্রে বিজেপি কিছুটা সফল। বিজেপির মোকাবিলায় শুধু নির্বাচনে হারজিতকে পাখির চোখ করেছে তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলি। যার ফলে বিজেপি যদি রাজনৈতিক সুবিধা পেয়ে যায় এই আশঙ্কায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রবল ভাবে না নেমে নরম হিন্দুত্বের পথ নিয়েছে তারা। বিজেপির লাভ এখানেই। অবাঙালিদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দলগত ভাবে অংশগ্রহণ করা এবং সেই লক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করায় প্রশাসন অতি উৎসাহী। শাসকদলের এই পথে প্রধান প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় মেরুকরণের রাজনীতিই পুষ্ট হয়ে চলেছে। নেতৃত্বহীনতায় ভোগা বাম দলগুলি ক্রমশ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলেছে। তাদের অস্তিত্ব সংকট অন্যদিকে, কংগ্রেসও দু একটি জেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে অধর্মও মেরুকরণের ভূত ছায়া বিস্তার করছে রাজ্যে। মেরুকরণের ‘আমরা ওরা ‘ বিভেদ ও এখন ধর্মের ঘেরাটোপের বাইরে ছড়াতে শুরু করেছে। জাতি পরিচিতিকে ঘিরে এই বিস্তার এখন অনেকটাই প্রকাশ্যে। আগে যা চোরা স্রোতের মত ছিল এখন তা রাজবংশি, নমশুদ্র, কুর্মি, ব্রাহ্মণ, গোর্খা জাতির ভোট পাওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টায় সামাজিক স্তরে বেগবান হয়েছে। এই বদলের ফলে জাতি সমীকরণ এবং জাতি ভিত্তিক প্রচার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এখন সরকারের কল্যাণমুখী নীতির মধ্যেও এই জাতি পরিচিতির রাজনীতির যোগাযোগ স্পষ্ট। এরফলে বাঙালার রাজনীতিতে ‘ভদ্রলোকের ‘ আধিপত্য ধাক্কা খেয়েছে। বর্ণ হিন্দু ভদ্রলোকেরা তাদের আসন শক্ত পোক্ত রাখতে চেষ্টা করবেন ।সব মিলিয়ে বলা যায় এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বাঙলার তথা বাঙালির যে সার্বিক ঐতিহ্য তা পরীক্ষার মুখে। ফল বেরোনোর পর বোঝা যাবে এই ভূখন্ডের অধিবাসীরা কেমন রাজ্য চান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *