৯১ লক্ষ ভোটার বাদ দিয়ে এবার নির্বাচন বিষাদ গণতন্ত্রের মহড়ায় পরিণত হচ্ছে

Bengal Election 2026

বিশেষ প্রতিবেদন, কলকাতা

বাংলার আকাশে-বাতাসে এখন ভোটের বাদ্যি বাজার কথা। কিন্তু অদভূত এক নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে পাড়ার মোড় থেকে গ্রামের চায়ের দোকান পর্যন্ত। আমরা যাকে ‘গণতন্ত্রের উৎসব’ বলে জানি, ২০২৬-এর এই বিধানসভা নির্বাচন কি আদেও সেই উৎসবে পরিণত হতে পারছে? না কি একে ‘বিষাদ গণতন্ত্রের’ এক মহড়া বলাই ঠিক হবে? এই সংশয় আজ বাংলার কোটি কোটি মানুষের মনে।রাস্তায় পরিচিত মুখ দেখলেই এখন কুশল সংবাদের আগে প্রশ্ন উঠছে— “ভোটার লিস্টে নাম আছে তো?” কেউ বলছেন নিজের নাম থাকলেও ছেলের নাম নেই, কেউ বা বলছেন গিন্নি আর ছেলে ভোটাধিকার পেলেও বাড়ির কর্তার নামটাই গায়েব হয়ে গেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এই দৃশ্য আরও ভয়াবহ। মালদা থেকে মুর্শিদাবাদ— যেদিকেই তাকায়, একে অপরকে সান্ত্বনা দেওয়ার মানুষের অভাব নেই, কিন্তু চোখের জলে মিশে আছে এক অদ্ভুত অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই এই নাম বাদ পড়ার হিড়িক? লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে আজ রাষ্ট্রহীন বা ‘বেনাগরিক’ হওয়ার ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে।

কঠিন এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বাংলায় এসে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা ‘ঘুষপেটিয়া’ তকমা দিয়ে ভয় দেখান, তখন ক্ষতটা আরও গভীর হয়। সনাতন হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে কৃত্রিম বিভেদ তৈরির এই পরিবেশ কি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ?শুধু সংখ্যালঘু নয়, সংকটে আজ মতুয়া সমাজও। যাঁরা প্রাণ বাঁচাতে ওপারে জমি-ঘর ফেলে এসে এদেশের নাগরিক হিসেবে বছরের পর বছর অধিকার ভোগ করেছেন, আজ তাঁদের নতুন করে নাগরিকত্বের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে রাজবংশী ও আদিবাসী সমাজের বহু প্রান্তিক মানুষের নামও। কোচবিহারের সেই ছিটমহলগুলো, যারা একদিন অনেক লড়াই করে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, আজ তারা তালিকার বাইরে। তাঁদের স্বপ্ন কি তবে এক টুকরো কাগজেই শেষ হয়ে যাবে?

নির্বাচন কমিশন সর্বশেষ তথ্যে জানিয়েছে, ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন থাকা ৬০ লক্ষ মানুষের মধ্যে ২৭ লক্ষেরই নাম খারিজ হয়ে গেছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটাধিকার থেকে দূরে সরিয়ে যে নির্বাচন হবে, তাকে কি পূর্ণাঙ্গ জনগণের রায় বলা চলে?

বাংলার মাটিতে আজ যে পরিমাণ সেনাবাহিনী আর সাঁজোয়া গাড়ির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে পাকিস্তান সীমান্তের কোনো অপারেশনের প্রস্তুতি চলছে। বুথ পাহারা দিতে সাঁজোয়া গাড়ি নামানো কি গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ না কি ভীতি প্রদর্শনের অস্ত্র? বাংলাকে বহির্বিশ্বের কাছে যেভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তাতে একটি বিশেষ শক্তিকে বাংলার জমিতে ফায়দা তোলার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে না তো? আগামী দিনে বাংলার মসনদে যেই বসুক না কেন, প্রায় এক কোটি মানুষের রায় ছাড়াই সেই সরকার গঠিত হবে। পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় আসার এই যে আয়োজন, তাকে ইতিহাস কখনও ক্ষমা করবে না। মানুষের আবেগ আর চোখের জলের তোয়াক্কা না করে যে নির্বাচন হয়, তা শান্তি দিলেও স্বস্তি দিতে পারে না।গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বক্স নয়, গণতন্ত্র হলো মানুষের আস্থা। আর সেই আস্থাই আজ বাংলার মাটিতে সবথেকে বড় সংকটের মুখে।