ভোটার তালিকায় বাদ পড়া সংখ্যালঘুদের অনুপ্রবেশকারী দাগিয়ে দিয়ে আসলে রাজনৈতিক সমীকরণের খেলা চলছে

SIR List controversy

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট সাংবাদিক

১৯৫১/৫২ সালে ভারত নামক একটি সদ্য ভূমিষ্ঠ দেশে প্রথম জাতীয় নির্বাচন হয়েছিল। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রথম জাতীয় সরকারের চেষ্টা কতটা আন্তরিক ছিল, তা রাজনীতির খাতায় দিয়ে রাখলাম। অত্যন্ত দরিদ্র, অত্যন্ত জনবহুল, অতি অশিক্ষার অন্ধকারে ঢাকা সদ্য স্বাধীন দেশটির সংখ্যা গরিষ্ঠ অধিবাসীর কাছে নাগরিকত্বের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এমন এক সংশয় দীর্ণ, সংকটপূর্ণ সময়ে সমস্ত মানুষের কাছে গণতান্ত্রিক অধিকার পৌঁছে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন এক বঙ্গ সন্তান। স্বাধীন দেশের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুকুমার সেন। তাঁর নিরলস পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনী ক্ষমতায় উঁচু নিচু এবং এ ধর্ম, সে ধর্ম সহ সব ভারতবাসীর নারী পুরুষ নির্বিশেষে ভোটার হিসেবে ‘নতুন পরিচয় পত্র তৈরি হয়েছিল। সেই সময় থেকে দিনের পর দিন গেছে নিদারুণ কষ্ট, বঞ্চনা, দারিদ্র্যের মধ্যেও ভোটাধিকার নামক সম্পদ, সম্মান ও গৌরব অক্ষুন্ন থেকেছে। অন্তত , ভোট পর্বে রাষ্ট্রের কাছে আমরা যে অতি প্রয়োজনীয় এই উপলব্ধিতে উদ্দীপিত হয়েছি, ভেবেছি, ‘ রাজার ঘরে যে ধন আছে, টুনির ঘরেও সে ধন আছে ‘। এই সুখস্মৃতির প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গে এস আই আর পর্বে ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যেতেই পারে। কিন্তু, ২৭ লক্ষ্য মানুষের নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি স্মরণ করুন। এর মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত,ভুয়ো নাম হিসেবে একটি বড় অংশের নাম বাদ যেতেই পারে। কিন্তু, ২৭ লক্ষের নাম ‘ বিবেচনাধীন ‘ থাকা অবস্থাতেই এবার ভোটার তালিকা থেকে তারা বাতিলের খাতায় চলে গেলেন। অথচ, ১৯৫১-৫২ থেকে দেশের নির্বাচনী সরণীতে দেশের মানুষকে নাগরিক ও ভোটার করার কাজটি রাষ্ট্রই করে এসেছে। এবারে রাষ্ট্রের চলন ভিন্ন পথে। পশ্চিমবঙ্গের এস আই আর পর্ব ভারতীয় গনতন্ত্রের ইতিহাসকে ব্যর্থতা ও হতাশার মেঘে ঢেকে দিল। ‘ বিবেচনাধীন ‘ ‘২৭লক্ষের সবাই হয়তো বৈধ ভোটার নন। কিন্তু, সবাই যে অবৈধ ভোটার নয় তা তো সুপ্রিম কোর্টের বিচার বিভাগের ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থাতেই স্পষ্ট। এর থেকে আরো একটি বিষয় স্পষ্ট যে শুধু মাত্র পদ্ধতিগত ও সময়জনিত সমস্যায় সবার ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গেল না। এর থেকে যে সংশয় জন্ম নেয় তা হলো ভোটাধিকার কাদের কখন থাকবে, কখন থাকবে না তা কি রাষ্ট্রের ইচ্ছা ও ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল? বিশেষত মহিলা ও সংখ্যালঘুরা যখন এই অধিকার হরণ যজ্ঞের প্রধান বলি তখন এই সংশয় কি আরো গাঢ় হয় না ? সম্প্রতি মালদার মোথাবাড়িতে যে ঘটনা দেখা গেল তা পরিস্থিতিকে অনেকটাই ঘুলিয়ে তুলেছে। বিচার বিভাগ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারকদের যে ভাবে ঘেরাও করে রাখা হল তা কোনো সভ্য সমাজের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই দুরাচারের তলায় যে অসংখ্য মানুষের গ্লানি, ক্ষোভ ও হতাশা চাপা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তাও সভ্যতার ধারক হতে পারে না। বিশেষত মানুষ থেকে না মানুষে রূপান্তরিত হওয়ার ভয় যারা পাচ্ছেন তাদের প্রতি শাসক ও প্রধান বিরোধী দলের দৃষ্টি ভঙ্গি অত্যন্ত ধিক্কারজনক। সেদিন যারা বিচারকদের বন্দি করে রাখার জঘন্য পরিকল্পনায় অংশ না নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ – বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাদের প্রতি শাসকের আচরণ যেন এই সম্প্রদায়ের যাদের ভোট রয়েছে তারা আমাদের ভোট না দিয়ে কোথায় যাবে ? আর প্রধান বিরোধী দল তো গোটা সম্প্রদায়কেই ‘অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করে ভোটে নেমেছে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে হতে চলেছে ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন। আমাদের মধ্যে যারা বৈধ ভোটার হিসেবে চিহ্নিত তারা যখন ভোটের দিন বুথের লাইনে দাঁড়াবো তখন যেন মনে রাখি ভোটের অধিকার হারানো অনেক বৈধ ভোটারকে বাইরে রেখেই আমরা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছি। ‘নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব ‘ , এই উচ্চারণকে আমরা যেন নির্বাসিত রাখি। প্রতিবেশীরা দুর্ভাগ্যের শিকার হলে তাদের সামনে উৎসবের হর্ষ না ছড়ানোই বাংলার রীতি।