‘ ধর্ম নিরপেক্ষতা ত্যাগ করুন ‘- প্রতিবাদ দূরের কথা চুপ থেকে চোরা সমর্থন মধ্যবিত্তের ভন্ডামি দ্বিচারিতা ধরা পড়েছে

SIR Deleted voter controversy

বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য

নিশীথ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় শুনেছিলেন রাতের কল্লোল শুধু বলে যায় ‘ আমি স্বেচ্ছাচারী ‘। আজ ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে দাঁড়িয়ে আমরা যেন শুনছি ভারতীয় গণতন্ত্রে শুধু বলে যাচ্ছে ‘ আমি স্বেচ্ছাচারী ‘ । সৌজন্যে এস আই আর। ভোট এলেই কুকথার বান ডাকবে। ভোটের আগে পরে রাজনৈতিক হিংসা ছড়াবে, রক্ত ঝরবে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন কঠোর হাতে ভোট পরিচালনা করবে। মাইলের পর মাইল শান্তি কল্যাণের ছায়ায় মানুষ নিজের ভোট নিজে দেবে। যে দল ই জিতুক না কেন রাজনৈতিক হিংসা অতীত হয়ে যাবে।

আমরা যারা এই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম তারা কী দেখলাম! ভোটের অধিকার আদায়ের জন্য, নিজ ভূমে পরবাসী না হওয়ার জন্য নথি, দস্তাবেজ হাতে নিয়ে সাধারণ গরীব মানুষ কে লাইনে দাঁড়ানোর পর্বের যেন শেষ নেই। প্রথম শুনানিতে লাইন। তারপর ট্রাইব্যুনালে নথি জমা দেওয়ার জন্য সব কিছু পিছনে ফেলে লাইন। ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা মানুষকে যখন বারবার লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করা হয় তখন কোন তন্ত্রীর সুতোর টানে গণতন্ত্র নাচে এই প্রশ্ন কি জাগবে না? বিশেষত, নেপথ্যে যখন বঙ্গভূমের চরাচর জুড়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গলায় শোনা যায় ‘চিহ্নিত করো, দেশ থেকে তাড়াও’। যখন প্রধান বিরোধী দলের তাবড় তাবড় কান্ডারীরা বলেন, ‘ যারা বাদ যাচ্ছে তারা সবাই অনুপ্রবেশকারী’। চুড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর দেখা যাচ্ছে মহিলা এবং মুসলিমদের নির্বিচারে সেই ভোটার তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। তাহলে কি এরা সকলেই সন্দেহভাজন? সকলেই অনুপ্রবেশকারী? স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন থেকেই তো সব ভোটারদের ভোট দানে উৎসাহিত করা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হিংসা, ভুতুড়ে ভোটারকে রোখাই মূলমন্ত্র হয়ে এসেছে কমিশনের। এই কাজ করতে গিয়ে দেশের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার প্রবাদপ্রতিম সুকুমার সেন থেকে টি এন শেষন সহ অন্যান্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের সময়কালে কমিশনের এই মন্ত্র ই তো বেজেছে। ফলে প্রশ্ন তো উঠবেই গণতন্ত্রের কোন শর্তে এবার এস আই আর এর নামে উলটপুরাণ শুরু হলো? এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ধিক্কারজনক হলো আমাদের চারপাশে কেমন যেন নির্লিপ্ত, নিশ্চুপ পরিসর বিরাজমান।

প্রথম দিকে যখন ‘যুক্তিগত অসঙ্গতিতে ব্রাহ্মণ , ক্ষত্রিয় , বৈশ্য সম্প্রদায়ের ‘ভদ্রজনেদের’ ডাক পড়ল শুনানিতে তখন মহানগরের মধ্যবিত্তদের টনক নড়েছিল। বোঝা গেছিল বাঙালির সমাজ সংস্কৃতি না বোঝা, পদবির ইতিহাস না বোঝার গুঁতো বড়ই ক্লেশের, কষ্টের। তার আগে পর্যন্ত কি নিশ্চিন্তি! ভাবখানা ছিল বাদ গেলে তো মুসলমানদের যাবে আমাদের কি? আর এখন তো পরিষ্কার দলে দলে যারা বাদ পড়লেন তাঁদের বৃহৎ অংশ মহিলা এবং মুসলমান। ফলে ফিরে এসেছে সেই নিশ্চিন্তি। যা না হলে গরিব মানুষ, মুসলমান আর মহিলাদের নাম বাদ যাওয়ার রুকুসুখু পরিসরে দাঁড়িয়ে আমরা গায় মাখছি প্রধান বিরোধী উল্লাসের রেনু। সেই সঙ্গে শহুরে মধ্যবিত্তের ভন্ডামি। দ্বিচারিতাও যেন আকাশ স্পর্শ করছে।

কিছুদিন আগেই আমাদের এক মেয়ের নৃশংস পরিনতির বিচার চেয়ে আমরা রাত জেগেছি, শহর অবরুদ্ধ করেছি। আর এখন এতো মহিলা আশঙ্কা, ভয়ের মধ্যে ডুবে গেলেও তাদের আমরা সহ নাগরিকের মর্মিতা দিচ্ছি না। আর মুসলমানরা? আমরা ভাবছি ওরে বাবা ওরা তো প্রায় সবাই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ওরা চুপি চুপি আমাদের জায়গা দখল করছে। তাই তো কেউ যখন বলেন , ‘ বাঙালি কে সংখ্যালঘু হতে দেব না’ তখন আমরা আহ্লাদে ফেটে পড়ি। কেউ যখন আর একটু এগিয়ে বলেন, ‘ ধর্ম নিরপেক্ষতা ত্যাগ করুন ‘ তখন প্রতিবাদ তো দূরের কথা চুপ থেকে চোরা সমর্থন বার্তা আমরা ভাসিয়ে দিই। বঙ্গ জীবনে এমন অনেক দিশেহারা সময় এসেছে। সেই প্রতিটি সময় মণীষা দীপ জ্বেলে পথ দেখানোর জন্য যে শীর্ষমস্তক বাঙালিরা ছিলেন তাঁরা আজ নেই।

ভোটের আসা যাওয়া থাকবে। কিন্তু, বাঙালির উদারতার, অসাম্প্রদায়িকতার, মুক্তচিন্তার সামনে আজ যে রাজনৈতিক পরীক্ষা তা উতরোনোর দায় আমাদেরই নিতে হবে। অভিভাবকহীন বহু সন্তান ই তো কৃতী হয়। আমাদের ও প্রমাণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে আজ বাঙালির সামনে আর আত্মসংস্কৃতির , আত্মমননের পরীক্ষা।