এরা কারা ! বাংলায় নারীর প্রতি এই অসন্মান শালীনতার সব সীমা পার করেছে চূপ থাকা পাপ

Mamata Banerjee Social Media post Controversy

বিশ্বজিত ভট্টাচার্য, বিশিষ্ট সাংবাদিক

সপ্তদশ শতাব্দীতে নেপালের কাঠমান্ডু থেকে তিব্বতের লাসা এই দীর্ঘ কঠিন পথে বানিজ্য চলতো। নেপাল থেকে যে ব্যাবসায়ীরা পন্য নিয়ে যেতেন তাঁদের পায়ে চলা পথ শেষ হতো তিব্বতের সীমান্ত জনপদ কুটিতে। সেখান থেকে তারা খচ্চরের পিঠে পন্য চাপিয়ে লাসায় যেতেন। কুটির প্রবেশ পথে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য রাস্তা জুড়ে কৌপিন টাঙিয়ে রাখতেন। তার নীচে দিয়েই নেপালের ব্যাবসায়ীদের মাথা নিচু করে যেতে হতো। তিব্বতের কুটির সেই বানিয়ারাও এই কদর্য মিম দেখে হয়তো লজ্জায় নির্বাসনে যেতেন। প্রতিদ্বন্দ্বী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে নিয়ে এই কদর্য মিমের সামনে তারা শিশু। কদর্য শব্দটিও যেন ওই মিমকে বর্ণনা করতে বড়ই গরীব। ভোটের আগে এই বাংলায় তীব্র ঘৃণা, দ্বেষ এর যে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে তারই সন্তান এই মিম। শুধু মুখ্যমন্ত্রীর নারীত্ব নয় , সাম্প্রদায়িকতার গরলও মিশে রয়েছে। মিমটিতে দুটি বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য বস্তু করা হয়েছে। মিমের বর্শা মুখে বিদ্ধ নারী ও একটি বিশেষ ধর্মীয় সত্ত্বা।

এই মিমের কারিগর যারা তাদেরই উন্মুক্ত তরোয়ালে গাঁথা বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের গর্ভবতী মহিলার ভ্রুণ তো এই দেশ দেখেছে। তবে, সেই নারকীয় ঘটনা ছিল অন্য এক নদীর পাড়ে, অন্য রাজ্যে। এবার সেই ঘৃণার দন্ড ছুঁলো গঙ্গা পাড়ের রাজ্যকে। এতো শুধু ভোটে জেতার তাগিদ নয়। এ হলো মগজ দখলের লড়াই। রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক খোল নলচে বদলে দেওয়ার লড়াই। এ বদলের চেষ্টার দিকচিহ্ন মিমটিতে স্পষ্ট। এখানে নারী শুধুই যৌনগন্ধা। নারী শুধুই শরীর। সে যেই হোক না কেন। ধর্মীয় আক্রমণের প্রবল কুৎসিত ইঙ্গিত ও রয়েছে। বাংলা বদলের এই দুঃসাহস কি একদিনে হলো ! আমরা বাঙালি যারা এই বঙ্গে বাস করি তারা কি বেশ কিছু সময় ধরে কুরুচিকর রাজনৈতিক ভাষা শুনে আহ্লাদ প্রকাশ করিনি। অন্তরের গরলে জাল দিয়ে নীরব সম্মতি জানাই নি! অথচ রাজনৈতিক টিপ্পনির এক মননশীল ঐতিহ্য তো দাদাঠাকুর, ভবানীচরণের হাত ধরে বাঙলার ঐতিহ্যের স্ট্রংরুমে রয়েছে। রাজনৈতিক কার্টুনেও তো আমাদের ভাঁড়ার অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

মন্বন্তর থেকে ক্ষমতার হাত যখনই আমাদের কন্ঠরোধ করেছে তখনই তো আমাদের শিল্প, গ্ৰাফিতি রাজনৈতিক অঙ্গীকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সেই স্মৃতির সংরক্ষণাগারের চাবিটি কি তবে হারিয়ে গেল? এই শহরেই ভোটে দাঁড়িয়ে প্রচারে বেরিয়ে বিধান চন্দ্র রায় তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর একান্ত ভক্ত এক ধনীর বাড়িতেও গিয়েছেন। সেই ব্যক্তি তাঁর পরিচয় পেয়ে রেগে গিয়ে বিধান চন্দ্র কে বলেছিলেন তুমি এম ডি নয়, ম্যাড ডি। প্রত্যুত্তরে বিধান চন্দ্র হাসিমুখে তাঁর ভোট প্রচারের বাধ্যতার কথা শুনিয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক সৌজন্যের সামনে নত হয়েছিলেন ওই ধনী ব্যক্তি। আর রাজনৈতিক কার্টুন তো পৃথিবীর অতি শক্তিশালী, একনায়কদের ও ভ্রুক্ষেপ করেনি। দেওয়ালে, ক্যানভাসে প্রতিরোধের কথা, ছবি এঁকেছে । ডিজিটাল যুগে এসেছে মিম।

তবে, বড় পার্থক্য হলো সেই শিল্প ছিলো মানুষের প্রতিবাদ, আর মিম এখন মূলতঃ ক্ষমতার কারবারির অনুগতদের হাতিয়ার। এই সংখ্যাগুরুতন্ত্রের হানাদারির সামনে আমরা আর কতদিন আত্মনাশা অবস্থানে থাকবো? এবারে কি আমরা বলবো না, অনেক ঔদ্ধত্য দেখিয়েছো, এবার দেখো আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের নির্মাণ আমরাই করবো। এ রাজ্যে থাকতে হলে তোমাদেরও নির্মাণ করবো।