Sons of the soil from Birbhum have returned to their homeland from exile.
বিশেষ রির্পোট
বীরভূম: দীর্ঘ এক বছরের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা, সীমাহীন আতঙ্ক আর চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার অবসান। অবশেষে নিজেদের ভিটেমাটিতে, স্বদেশের চেনা বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছেন বীরভূমের পাইকর গ্রামের সুইটি বিবি এবং তাঁর সন্তানরা। যে মানুষগুলোকে শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ সন্দেহভাজন বাংলাদেশি তকমা সেঁটে কাঁটাতারের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, আজ তাঁদের ঘরে ফেরা শুধু একটি আইনি জয় নয়— এটি বাঙালির আত্মসম্মান ও অস্তিত্ব রক্ষার এক ঐতিহাসিক বিজয়। আর এই অসাধ্য সাধনের নেপথ্যে যাঁর নিরলস জেদ এবং মানবিক উদ্যোগ ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তিনি বীরভূমেরই ভূমিপুত্র তথা রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম।
মানবিকতার চরম অবমাননা: দিল্লির সেই অন্ধকার রাত
ঘটনার সূত্রপাত গত বছর ২৩ জুন। দিল্লির রোহিণীনগর এলাকা থেকে বীরভূমের পাইকর ও ধিতোড়া গ্রামের ৬ জন নিরীহ পরিযায়ী শ্রমিককে তুলে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। অপরাধ? তাঁরা বাংলায় কথা বলেন। তাঁদের কাছে বৈধ আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, সেগুলোকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা হয়।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই দলে ছিলেন একজন গর্ভবতী নারী (সোনালী বিবি) এবং তাঁর ছোট ছোট সন্তান। ২৫ জুন তাঁদের বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং ২৬ জুন অসম সীমান্ত দিয়ে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। কোনো আইনি নোটিশ নেই, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই— স্রেফ সন্দেহের বশে একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকদের এমন অমানবিক পরিণতি গোটা দেশের মানবাধিকার নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দেয়। বাংলাদেশে গিয়ে তাঁদের ঠাঁই হয় রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার পুলিশের হাতে। শুরু হয় রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন এক ভয়ংকর জীবন।
সাংসদের শপথ: “ওরা আমার রক্ত, আমার শিকড়”

খবরটি যখন বীরভূমে এসে পৌঁছায়, তখন রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলাম স্থির থাকতে পারেননি। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং বীরভূমের মাটির সন্তান হিসেবে তিনি এই যন্ত্রণাকে নিজের বলে গ্রহণ করেন। তাঁর কথায়, “বীরভূমের মানুষদের আমি শুধু ভোটার হিসেবে দেখি না। ওরা আমার রক্ত, আমার পরিবার। এই ঘটনা শুনে মনে হয়েছিল, আমার নিজের বাড়ির দরজা ভেঙে কেউ হানা দিয়েছে।”
যখন কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার, দিল্লির ভারতীয় দূতাবাস নীরব দর্শকের ভূমিকায়, তখন সাংসদ সামিরুল ইসলাম একাই লড়াইয়ের ময়দানে নামেন। ফোনে সোনালীর সেই আর্তনাদ— “আমরা কি আর কখনও দেশে ফিরতে পারব?”— সাংসদকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিল, যেকোনো মূল্যে ওদের ফিরিয়ে আনতেই হবে। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে মফিজুল শেখ নামের এক যুবককে বাংলাদেশে পাঠান এই অসহায় পরিবারগুলোর বাস্তব অবস্থার খোঁজ নিতে।
মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ এবং দুই দেশের আদালতের ঐতিহাসিক রায়
লড়াইটা শুধু সাংসদের একার থাকেনি। সামিরুল ইসলাম গোটা বিষয়টি সেই সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গোচরে আনেন। এক মুহূর্তও দেরি না করে ম দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, বাংলার প্রতিটি মানুষের সুরক্ষা রাজ্যের দায়িত্ব। শুরু হয় এক দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর আইনি যুদ্ধ।
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫— কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায়ে কেন্দ্র সরকারের সিদ্ধান্তকে সরাসরি খারিজ করে দেয়। আদালত কড়া ভাষায় নির্দেশ দেয়, সন্তানসম্ভবা সোনালী বিবি-সহ বীরভূমের ৬ জন পরিযায়ী শ্রমিককে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরিয়ে আনতে হবে।
এরপর আসে ১১ অক্টোবর, ২০২৫। এবার বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিম্ন আদালতও স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, সোনালী-সহ আটক পরিযায়ী শ্রমিকরা নিশ্চিতভাবেই ভারতের নাগরিক। বাংলাদেশের আদালত নির্দেশ দেয়, আইনি প্রক্রিয়া মেনে অবিলম্বে তাঁদের ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেই নির্দেশের কপি পৌঁছায় বাংলাদেশে অবস্থিত ভারতীয় হাই কমিশনেও।

সন্তানের জন্ম, স্বামীর বিচ্ছেদ ও চূড়ান্ত আইনি টালবাহানা
দুই দেশের আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশের পরেও কেন্দ্রের অনমনীয় মনোভাব পরিস্থিতিকে ক্রমশ আরও জটিল করে তোলে। চরম অনিশ্চয়তার মুখে সন্তানসম্ভবা সোনালী বিবি ক্রমশ অসুস্থ হতে শুরু করেন। তাঁর গর্ভের সন্তানের জন্ম কোথায় হবে— তা নিয়ে এক গভীর ও ভয়ংকর মানবিক সংকট তৈরি হয়। কারণ, সন্তানের জন্ম যদি ভিনদেশে বন্দিদশায় হয়, তবে সেই সদ্যোজাতের নাগরিকত্ব নিয়ে চরম আইনি জট তৈরি হতো।
একদিকে ভারতীয় হাই কমিশনের চূড়ান্ত নিষ্ক্রিয়তা, অন্যদিকে অন্ত্বঃসত্ত্বা মায়ের ক্রমশ খারাপ হতে থাকা শারীরিক অবস্থা— এই যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতেও হাল ছাড়েননি সাংসদ সামিরুল ইসলাম। অ্যাডভোকেট সঞ্জয় হেগড়ে, সৌম্য দত্ত, রঘুনাথ চক্রবর্তী-সহ অন্যান্য আইনজীবীদের নিরলস লড়াই অবশেষে চূড়ান্ত রূপ পায় যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত (সুপ্রিম কোর্ট) হস্তক্ষেপ করে।
সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশের পরই বাধ্য হয়ে কেন্দ্র সরকার প্রথম দফায় শুধুমাত্র সোনালী বিবি ও তাঁর এক নাবালক পুত্রকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে। দেশে ফেরার পরেই সোনালী তাঁর সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু তখনও তাঁর স্বামী হানিশ শেখ পড়ে ছিলেন কাঁটাতারের ওপারে।
অবশেষে, এতগুলো মাস কেটে যাওয়ার পর, আজ সম্পূর্ণ হলো সেই লড়াই। সোনালীর স্বামী দানিশ শেখ, সুইটি বিবি এবং তাঁর দুই সন্তান দীর্ঘ অপেক্ষার পর পা রাখলেন নিজেদের দেশের মাটিতে।

বাঙালির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করার চক্রান্ত রুখে দেওয়ার মডেল
বীরভূম প্রতিবাদের মাটি। সাংসদ সামিরুল ইসলামের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে দিয়েছে যে, জনপ্রতিনিধি যদি সৎ হন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস রাখেন, তবে রাষ্ট্রের যেকোনো অন্যায় সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। গত ডিসেম্বরে সোনালী এবং আজ সুইটি বিবি ও দানিশ শেখরা শুধু নিজেদের ঘরেই ফেরেননি, তাঁরা ফিরেছেন এক বুক সম্মান নিয়ে।
সামিরুল ইসলামের এই লড়াই আগামী দিনের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল— রাষ্ট্র মানে শুধু সীমানা নয়, রাষ্ট্র মানে মানুষ। আর সেই মানুষদের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার স্পর্ধা দেখালে, তার জবাব কীভাবে দিতে হয়, বাংলা তা আরও একবার দেখিয়ে দিল।
