ধর্মতলার একুশ: যে মঞ্চে বদলেছিল বাংলার রাজনীতির ইতিহাস

Permission denied for Trinamool’s July 21 rally at Dharmatala.

নিজস্ব প্রতিবেদন

একটি অধ্যায়ের ইতি, নাকি নতুন ইতিহাসের সূচনা?

কলকাতার ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ২১ জুলাই শহীদ দিবসের সমাবেশ—এই দৃশ্য গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই রাজপথে দেখেছে মানুষের ঢল, স্লোগান, পতাকা, বৃষ্টিভেজা জনসভা এবং এক নেত্রীর রাজনৈতিক বার্তা।এবার সেই পরিচিত ঠিকানায় আর ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ হচ্ছে না। প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে রাজনৈতিক কর্মসূচির অনুমতি না মেলায় বিকল্প স্থানে সভা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফলে ১৯৯৩ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ধর্মতলার যে অংশ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী ছিল, সেখানে অন্তত আপাতত একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে।

রক্তাক্ত ১৯৯৩: ইতিহাসের শুরু

২১ জুলাই ১৯৯৩। নির্বাচনে সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার দাবিতে তৎকালীন যুব কংগ্রেস সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহাকরণ অভিযানের ডাক দেন। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট সরকার। আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনাই পরবর্তীকালে ২১ জুলাইকে ‘শহীদ দিবস’-এর রাজনৈতিক ও আবেগঘন পরিচয় দেয়।তারপর থেকে প্রতি বছর ধর্মতলার এই অংশে শহীদদের স্মরণে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হতে থাকে। প্রথমে কংগ্রেস, পরে তৃণমূল কংগ্রেস সেই ঐতিহ্য বহন করে।

প্রতিবাদ থেকে প্রতিজ্ঞার মঞ্চ

১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস গঠনের পর ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ নতুন অর্থ পায়। এটি শুধু স্মরণসভা থাকেনি; হয়ে ওঠে দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ।প্রতিবছর এই মঞ্চ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতেন, সংগঠনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির রূপরেখা দিতেন এবং কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা পৌঁছে দিতেন। রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলের ইঙ্গিত প্রথম শোনা গেছে এই মঞ্চ থেকেই।

ধর্মতলা থেকে জাতীয় রাজনীতির বার্তা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ২১ জুলাইয়ের সভা শুধু পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা এই মঞ্চে এসে উপস্থিত থেকেছেন। জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থান, বিরোধী ঐক্যের বার্তা কিংবা কেন্দ্র–রাজ্য সম্পর্ক—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে এই সভা থেকে।ফলে ধর্মতলার এই মঞ্চ শুধু একটি দলের বার্ষিক কর্মসূচি ছিল না; এটি বহু সময়ে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনারও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বৃষ্টিভেজা একুশের স্মৃতি

২১ জুলাইয়ের আরেকটি বিশেষ পরিচয় ছিল বৃষ্টি। বহু বছরই প্রবল বর্ষণের মধ্যেও কর্মীরা সভাস্থল ছাড়েননি। ছাতা, প্লাস্টিক, ভিজে পতাকা আর বৃষ্টির মধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষণ—এই দৃশ্য একুশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।

২০১১: পরিবর্তনের পরও ধর্মতলার টান

২০১১ সালে সরকার পরিবর্তনের পর একবার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঐতিহাসিক সমাবেশ হলেও পরবর্তী বছরগুলোতে আবার ধর্মতলাই ফিরে পায় ২১ জুলাইয়ের মূল মঞ্চের মর্যাদা। এই রাজপথেই প্রতিবছর শহীদ দিবস পালিত হয়েছে।

২০২৬: এক নতুন মোড়

এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সমাবেশের অনুমতি না মেলায় নতুন ভেন্যুর সন্ধান শুরু হয়েছে। ঠিক কোথায় সভা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—ধর্মতলার সঙ্গে ২১ জুলাইয়ের যে দীর্ঘ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

ইতিহাস থেমে থাকে না

রাজনীতিতে স্থান বদলায়, সময় বদলায়, কৌশল বদলায়। কিন্তু কিছু স্থান ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ তেমনই এক রাজনৈতিক প্রতীক।ভবিষ্যতে শহীদ দিবস অন্যত্র অনুষ্ঠিত হলেও, ১৯৯৩ সালের রক্তাক্ত আন্দোলন, প্রতিবছরের জনসমাবেশ, বৃষ্টিভেজা ভাষণ, বাংলার রাজনৈতিক পালাবদলের বার্তা এবং লক্ষ মানুষের আবেগ—সব মিলিয়ে ধর্মতলার এই রাজপথ বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে চিরকাল এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে থাকবে।সমাবেশের ঠিকানা বদলাতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের ঠিকানা বদলায় না।