বারুইপুর থেকে বদলাপুর— নারী নির্যাতনে অভিযুক্তদের পুলিশি এনকাউন্টারের খতিয়ান

বিশেষ রির্পোট

Encounter or ‘Instant Justice’? From Baruipur to Badlapur

পশ্চিমবঙ্গের বারুইপুরে ১২ বছরের এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে পুলিশি এনকাউন্টারে খতম করার ঘটনাটি দেশজুড়ে আবারও এক পুরোনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে। পুলিশের দাবি, ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশনের সময় অভিযুক্ত পুলিশের অস্ত্র কেড়ে পালানোর চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে পুলিশ গুলি চালায়।

ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশের এই ধরনের ‘এনকাউন্টার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ (Extrajudicial Killing) ভারতে নতুন নয়। সাধারণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের ঘটনাকে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ বা ‘ডিভাইন জাস্টিস’ বলে উল্লাস প্রকাশ করলেও, মানবাধিকার কর্মী ও আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে এটি গণতান্ত্রিক বিচারব্যবস্থার পরিপন্থী।

দেশের বিভিন্ন রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভিযুক্তদের এনকাউন্টারের একটি বিস্তারিত গবেষণামূলক তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. পশ্চিমবঙ্গ: বারুইপুর নাবালিকা ধর্ষণ ও খুন (জুলাই ২০২৬)

  • ঘটনা: ১২ বছরের এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ করে পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে উত্তাল হয় দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর।
  • এনকাউন্টার: ৮ জুলাই ২০২৬ গভীর রাতে (১২:৪৫ মিনিট নাগাদ) মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে সূর্যপুর এলাকায় ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশনের জন্য নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশের দাবি, সেই সময় প্রভাস এক অফিসারের সার্ভিস রিভলভার কেড়ে নিয়ে এক রাউন্ড গুলি চালায় এবং পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশের পালটা গুলিতে তার মৃত্যু হয়।
  • প্রেক্ষাপট: মে ২০২৬-এ রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটিই প্রথম পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনা। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে রাজ্যকে “ইউপি ২.০” বলে কটাক্ষ করেছেন। তবে অভিযুক্তের মা জানিয়েছেন, তাঁর ছেলে জঘন্য অপরাধ করেছে এবং সে সঠিক শাস্তিই পেয়েছে।

২. মহারাষ্ট্র: বদলাপুর স্কুল শিশু নিগ্রহ কাণ্ড (সেপ্টেম্বর ২০২৪)

  • ঘটনা: মহারাষ্ট্রের বদলাপুরে একটি নামী স্কুলে দুই ৪ বছরের শিশুকন্যাকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে স্কুলেরই চুক্তিভিত্তিক সাফাইকর্মী অক্ষয় শিন্ডের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার জেরে মহারাষ্ট্রজুড়ে তীব্র জনরোষ ও রেল রোকো আন্দোলন হয়।
  • এনকাউন্টার: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে, অভিযুক্ত অক্ষয় শিন্ডেকে তালোজা জেল থেকে তদন্তের জন্য বদলাপুরে নিয়ে যাওয়ার সময় সে এক পুলিশ কর্মীর পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায়। সঞ্জয় শিন্ডে নামে এক পুলিশ আধিকারিকের পালটা এনকাউন্টারে অক্ষয়ের মৃত্যু হয়।
  • পরবর্তী পদক্ষেপ: এই ঘটনার তদন্তের জন্য বম্বে হাইকোর্ট পরবর্তীকালে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের নির্দেশ দেয়।

৩. তেলেঙ্গানা: হায়দরাবাদ দিশা কাণ্ড (ডিসেম্বর ২০১৯)

  • ঘটনা: ২৭ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে হায়দরাবাদের অদূরে এক ২৬ বছর বয়সি পশু চিকিৎসককে (যাঁকে ‘দিশা’ নাম দেওয়া হয়) গণধর্ষণ করে পুড়িয়ে মারে চার লরি কর্মী।
  • এনকাউন্টার: ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ভোরে চার অভিযুক্তকে (মহম্মদ আরিফ, জল্লু শিবা, জল্লু নবীন, চেন্নাকেশাভুলু) ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশনের জন্য নিয়ে যাওয়া হলে পুলিশের দাবি অনুযায়ী তারা অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশের গুলিতে চারজনই নিহত হয়।
  • আইনি ধাক্কা: সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় উল্লাস প্রকাশ করলেও, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত ভি.এস. সিরপুরকার কমিশন পরে তদন্ত করে জানায় যে ওই এনকাউন্টারটি ছিল “সাজানো” (Staged)। কমিশন ১০ জন পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করার সুপারিশ করে, কারণ অভিযুক্তদের ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছিল বলে প্রমাণ মেলে।

৪. অসম: ‘জিরো টলারেন্স’ ও হিমন্ত মডেল

  • প্রেক্ষাপট: অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার আমলে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে পুলিশ অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যেখানে পুলিশি হেফাজতে পালানোর চেষ্টা করলেই গুলি চালানোর নির্দেশ রয়েছে।
  • ঘটনা: সম্প্রতি কামরূপে ১০ বছরের এক হিন্দু নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে ধৃত ৪০ বছরের আকাশ আলিকে পুলিশ হেফাজতে পালানোর সময় পায়ে গুলি করা হয়। অন্যদিকে অসমেরই আরেক ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত তফাজ্জল ইসলামকে ক্রাইম সিন রিক্রিয়েট করার সময় জলে ডুবে মৃত্যু হতে দেখা যায়, যা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়।

৫. উত্তরপ্রদেশ: যোগী আদিত্যনাথের ‘বুলডোজার ও এনকাউন্টার’ মডেল

  • প্রেক্ষাপট: ভারতে এই “এনকাউন্টার” সংস্কৃতির আধুনিক রূপকার হিসেবে উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ সরকারকে ধরা হয়। নারী নির্যাতন ও মাফিয়া রাজ দমনে ইউপি পুলিশের ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ (পায়ে গুলি করা) বা সরাসরি এনকাউন্টারের পদ্ধতি দেশজুড়ে চর্চিত।
  • প্রভাব: উত্তরপ্রদেশের এই মডেল এতটাই জনপ্রিয় (এবং একইসঙ্গে সমালোচিত) যে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি অন্যান্য রাজ্যে এনকাউন্টার হলেই তাকে “ইউপি ২.০” (UP 2.0) বলে কটাক্ষ করে।

সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ:

উপরের তালিকা থেকে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন স্পষ্ট— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ দাবি করে যে অভিযুক্ত গভীর রাতে বা ভোরে “অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিল” এবং পুলিশ “আত্মরক্ষার্থে” গুলি চালিয়েছে। জনরোষ সামাল দিতে এটি প্রশাসনের একটি চটজলদি হাতিয়ার হয়ে উঠলেও, হায়দরাবাদ দিশা কাণ্ডের সিরপুরকার কমিশনের রিপোর্ট প্রমাণ করে যে এই ধরনের ‘ইনস্ট্যান্ট জাস্টিস’ আইনের শাসনকে দুর্বল করে এবং পুলিশকে বিচারকের আসনে বসিয়ে দেয়।