খামেনির বিদায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ শোক কি বৃহত্তর সংঘাতের পূর্বাভাস?

Khomeini’s Final Journey and Funeral

বিশেষ প্রতিবেদন

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সমাপ্তি কেবল একজন দীর্ঘস্থায়ী নেতার বিদায় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একটি নতুন, জটিল ও চরম অনিশ্চিত অধ্যায়ের সূচনা। দীর্ঘ ৩৭ বছর ধরে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম দিনে সপরিবারে তাঁর নিহত হওয়ার ঘটনা গোটা বিশ্বকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইরান ও ইরাকজুড়ে প্রায় দেড় কোটি মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, এই শোক কেবল জাতীয় স্তরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি একটি বৃহত্তর আদর্শিক ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ। মাশহাদে তাঁর সমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে আধুনিক ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলেও, এর ভূ-রাজনৈতিক পরিণতি সুদূরপ্রসারী।

শোকের আড়ালে প্রতিশোধের আগুন তেহরান, কওম, নাজাফ, কারবালা হয়ে মাশহাদে গিয়ে শেষ হওয়া এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিছক কোনো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। শিয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র শহরগুলো প্রদক্ষিণ করার মাধ্যমে ইরান মূলত তার মতাদর্শিক প্রভাব বলয়ের শক্তি প্রদর্শন করেছে। ১৭৪৭ সালে নাদের শাহের পর খামেনিই হলেন দ্বিতীয় শাসক, যাঁকে মাশহাদে সমাহিত করা হলো। ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে যখন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়েদ মোস্তফা হোসেইনি খামেনি জানাজা পড়াচ্ছিলেন, তখন বাইরে জনসমুদ্রে উড়ছিল লাল পতাকা। শিয়া ঐতিহ্যে এই লাল পতাকার অর্থ হলো—যতক্ষণ না অন্যায়ভাবে নিহত ব্যক্তির রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ এই পতাকা অবনমিত হবে না। জনতার কণ্ঠে “আমেরিকা নিপাত যাক” এবং “ইসরায়েল নিপাত যাক” স্লোগানগুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইরানের সাধারণ জনগণ এই হত্যাকাণ্ডকে বিনা জবাবে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত নয়। এটি কেবল শোক নয়, এটি যুদ্ধের জন্য এক মানসিক প্রস্তুতি।

‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সংঘবদ্ধতা তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত আনুষ্ঠানিকতায় হামাস, প্যালেস্টাইন ইসলামিক জিহাদ, লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দলের উপস্থিতি একটি গভীর ভূ-রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এই উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, খামেনির মৃত্যুতে ইরানের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিসট্যান্স’ বা প্রতিরোধ অক্ষ ভেঙে পড়েনি, বরং তারা আরও সংঘবদ্ধ হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তাদের এই সম্মিলিত অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি যুদ্ধের মাত্রাকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে। একজন সর্বোচ্চ নেতার শূন্যতা পূরণে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে গাজা, লেবানন ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং অপ্রতিসম যুদ্ধের শঙ্কা (Asymmetric Warfare) এই উত্তেজনার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকটি হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে ইরানের সরাসরি হুমকি। মাশহাদের রাস্তায় কালো পোশাক পরিহিত জনতার হাতে থাকা ইংরেজিতে লেখা “হেই ট্রাম্প, আমরা তোমাকে হত্যা করব” প্ল্যাকার্ডগুলো নিছক কোনো আবেগপ্রসূত স্লোগান বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন—যেখানে ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে ট্রাম্পকে হত্যার নতুন ইরানি ছকের কথা বলা হয়েছে—পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের একজন নেতাকে সামরিক হামলায় হত্যা করার ঘটনা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখে ইরান। এর জবাবে তেহরান যদি সরাসরি সামরিক সংঘাতে না-ও জড়ায়, তবুও তারা অপ্রতিসম যুদ্ধনীতি (Asymmetric warfare) বা গুপ্তহত্যার মতো কৌশল বেছে নিতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ সংঘাতকে মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক রূপ দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমুদ্রের এই আস্ফালন মধ্যপ্রাচ্যকে এক খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। একদিকে মার্কিন-ইসরায়েল জোটের সামরিক আগ্রাসন, অন্যদিকে ইরানের প্রতিশোধের স্পৃহা—এই দুইয়ের ঘর্ষণে পুরো অঞ্চলটি একটি ভয়াবহ ও সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে। খামেনির যুগের অবসান ঘটলেও, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ এবং এই হত্যাকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষোভ ইরানকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের পথে পরিচালিত করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এই মুহূর্তে কার্যকরী কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তবে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার এই শোকের আগুন খুব দ্রুতই একটি বৈশ্বিক দাবানলে পরিণত হতে পারে, যার উত্তাপ থেকে কেউই রক্ষা পাবে না।