অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পলিগ্রাফি টেস্ট যেভাবে ল্যাবরেটরিতে চেনা যায় কণ্ঠস্বর

Forensic Voice Analysis

বিশেষ প্রতিবেদন, কলকাতা

নির্বাচনী প্রচারপর্বে ডিজে (DJ) সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। বর্তমানে এই মামলার তদন্তভার রয়েছে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি (CID)-র হাতে। তদন্তের স্বার্থে অভিষেকের কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করতে চেয়েছিল সিআইডি এবং আদালতও তাঁকে তদন্তে সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছিল। পূর্বনির্ধারিত নির্দেশ অনুযায়ী, গত বুধবার বিধাননগর আদালতে কণ্ঠস্বরের নমুনা দিতে যাওয়ার কথা ছিল তৃণমূল সাংসদের। কিন্তু আদালতের স্পষ্ট হাজিরা নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দ্বিতীয় বারের মতো সেই হাজিরা এড়িয়ে যান। সিআইডি আধিকারিকেরা তাঁর জন্য আদালতে দীর্ঘ দু’ঘণ্টা অপেক্ষা করলেও তিনি উপস্থিত না হওয়ায় আগামী ১৮ জুলাই ফের তাঁকে হাজিরার নোটিস দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চ অভিষেকের আইনজীবীকে কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করে। শুনানিতে বিচারপতি স্পষ্ট জানান, তদন্তে সহযোগিতার সব কিছুর একটা সীমা থাকা উচিত এবং অবিলম্বে নোটিসে সাড়া দিয়ে কণ্ঠস্বরের নমুনা দেওয়া প্রয়োজন। আদালত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে যে, অবিলম্বে তদন্তে সহযোগিতা না করলে অভিষেকের আইনি রক্ষাকবচ প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। আর এই রক্ষাকবচ উঠে গেলে সাংসদের বিরুদ্ধে যেকোনো কড়া পদক্ষেপ বা গ্রেফতারিতে সিআইডি-র আর কোনো আইনি বাধা থাকবে না।

এই ঘটনার আবহে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক—কী এই কণ্ঠস্বরের নমুনা পরীক্ষা? পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থাগুলো যখন কোনো অডিও রেকর্ডিংয়ের সত্যতা বা অভিযুক্তের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করতে চায়, তখন তারা ফরেনসিক ভয়েস অ্যানালিসিস (Forensic Voice Analysis) বা অডিও ফরেনসিকের সাহায্য নেয়। মানুষের কণ্ঠস্বর অনেকটাই আঙুলের ছাপ বা ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’-এর মতো অনন্য, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ভয়েসপ্রিন্ট (Voiceprint)

একটি অডিও ক্লিপ আসল নাকি নকল এবং সেটি নির্দিষ্ট ওই ব্যক্তিরই কণ্ঠ কিনা, তা ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে মূলত দুটি প্রধান বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়:

১. অ্যাকোস্টিক এবং স্পেকট্রোগ্রাফিক বিশ্লেষণ (Acoustic & Spectrographic Analysis)

এটি সম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত এবং গাণিতিক একটি পদ্ধতি। এর জন্য সাউন্ড স্পেকট্রোগ্রাফ (Sound Spectrograph) নামক বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়।

  • স্পেকট্রোগ্রাম তৈরি: সন্দেহজনক রেকর্ডিং এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের নমুনা (ভয়েস স্যাম্পল)—উভয়কেই এই সফটওয়্যারে ফেলা হয়। সফটওয়্যারটি কণ্ঠের শব্দতরঙ্গকে একটি ভিজ্যুয়াল চিত্রে রূপান্তর করে, যাকে বলা হয় স্পেকট্রোগ্রাম।
  • ফ্রিকোয়েন্সি এবং পিচ পরিমাপ: এখানে শব্দের মূল কম্পাঙ্ক (Fundamental Frequency), পিচ (Pitch), এবং রেজোন্যান্স (Resonance) নিখুঁতভাবে মাপা হয়। মানুষের ভোকাল কর্ডের (Vocal Cords) দৈর্ঘ্য এবং গঠন অনুযায়ী এই মানগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়।
  • ফরম্যান্ট অ্যানালিসিস: আমরা যখন কথা বলি, তখন আমাদের মুখগহ্বর, নাক এবং গলার ভেতরের ফাঁকা অংশের গড়ন অনুযায়ী শব্দের কিছু নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি বা ব্যান্ড তৈরি হয়, একে ‘ফরম্যান্ট’ বলে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা দুই রেকর্ডিংয়ের ফরম্যান্ট গ্রাফ মিলিয়ে দেখেন।

২. লিঙ্গুইস্টিক বা ভাষাগত বিশ্লেষণ (Linguistic/Auditory Analysis)

ডিজিটাল পরীক্ষার পাশাপাশি ফরেনসিক ল্যাবের ধ্বনিবিজ্ঞানীরা (Phoneticians) কান দিয়ে শুনে এবং কণ্ঠের উচ্চারণরীতি বিশ্লেষণ করেন।

  • আঞ্চলিক টান ও উচ্চারণ ভঙ্গি: ব্যক্তিটি কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ উচ্চারণ করছেন, তাঁর আঞ্চলিক টান (Dialect), কথা বলার গতি কেমন, তা লক্ষ্য করা হয়।
  • কথা বলার অভ্যাস: কোনো নির্দিষ্ট শব্দ বারবার ব্যবহার করা, কথার মাঝে শ্বাস নেওয়ার ধরণ, বা তোতলানো বা বিশেষ কোনো বাচনভঙ্গি (Idiolect) বিশ্লেষণ করা হয়।

কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় যে কণ্ঠটি ‘আসল’?

ল্যাবরেটরিতে মূল অডিও ক্লিপটি আসল নাকি কোনো এডিটিং সফটওয়্যার বা ডিপফেক (Deepfake) এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি, তা নিশ্চিত করতে আরও কিছু পরীক্ষা করা হয়:

  • অডিও টেম্পারিং চেক (Audio Tampering): মূল রেকর্ডিংয়ে কোনো কাট-ছাঁট, ওভারল্যাপিং বা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজের হঠাৎ পরিবর্তন আছে কিনা তা দেখা হয়।
  • একই শব্দের তুলনা: অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে ল্যাবে ঠিক সেই শব্দ বা বাক্যগুলোই বলানো হয়, যা বিতর্কিত অডিও ক্লিপটিতে শোনা গেছে। এরপর দুই ক্লিপের শব্দতরঙ্গ পাশাপাশি রেখে নিখুঁতভাবে মেলানো হয়।
  • এআই ও ডিপফেক সনাক্তকরণ: বর্তমান যুগে এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠস্বর ধরার জন্য আলাদা ফরেনসিক অ্যালগরিদম আছে। এআই ভয়েস যতই নিখুঁত হোক না কেন, মানুষের স্বাভাবিক ফুসফুসের বাতাস চলাচল এবং ঠোঁট-জিভের নড়াচড়ার যে অতি সূক্ষ্ম ‘অ্যাকোস্টিক আর্টিফ্যাক্ট’ বা প্রাকৃতিক বিচ্যুতি থাকে, তা এআই নকল করতে পারে না। ফরেনসিক সফটওয়্যার সেই সূক্ষ্ম অমিলগুলো ধরে ফেলে।

যখন স্পেকট্রোগ্রাফিক গ্রাফের অমিল এবং লিঙ্গুইস্টিক বিশ্লেষণ—উভয় দিক থেকেই শতভাগ মিল পাওয়া যায় এবং অডিওতে কোনো এডিটিংয়ের প্রমাণ মেলে না, তখনই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আদালতে রিপোর্ট দেন যে কণ্ঠস্বরটি ওই নির্দিষ্ট ব্যক্তিরই।