উচ্চশিক্ষায় নারীদের ঐতিহাসিক রেকর্ড, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে কেন এই বড় বৈষম্য?

Women’s historic record in higher education

বিশেষ প্রতিবেদন

ভারতের উচ্চশিক্ষার আঙিনায় তৈরি হয়েছে এক নতুন ইতিহাস। সাম্প্রতিক ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভে অন হায়ার এডুকেশন’ (AISHE)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত এক দশকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে নারীদের ভর্তির সংখ্যা এক ধাক্কায় ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকই নারী এবং প্রতি ১০০ জন ছাত্রের বিপরীতে ১০৮ জন ছাত্রী ক্যাম্পাসে পা রাখছেন।

কিন্তু এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক চরম বাস্তব। ডিগ্রি অর্জনে নারীরা রেকর্ড গড়লেও, সেই অনুপাতে মিলছে না সম্মানজনক কর্মসংস্থান। একদিকে ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তির মতো ভবিষ্যৎমুখী ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো মাত্র ৩১.১%, অন্যদিকে সাম্প্রতিক পিএলএফএস (PLFS) সমীক্ষা বলছে, পুরুষদের তুলনায় কর্মজীবী নারীদের গড় মাসিক আয় প্রায় ৬ হাজার টাকা কম! ডিগ্রি থাকার পরেও কেন ভারতের কন্যারা চাকরি বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন? শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কর্পোরেট জগত—গলদটা আসলে কোথায়? ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদন অবলম্বনে জেনে নিন এই গভীর সংকটের ভেতরের খবর।

উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার ও লিঙ্গ সমতা (AISHE 2023-24 ডেটা):

  • নারী ভর্তির বৃদ্ধি: গত এক দশকে উচ্চশিক্ষায় নারীর মোট ভর্তির সংখ্যা ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০১৪-১৫ সালের ১.৫৭ কোটি থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ২.২৪ কোটি হয়েছে।
  • পুরুষ ভর্তির বৃদ্ধি: একই সময়ে পুরুষদের ভর্তির সংখ্যা ১.৮৫ কোটি থেকে বেড়ে ২.২৬ কোটি হয়েছে (বৃদ্ধির হার ২২.১৬%)।
  • মোট ভর্তি: উচ্চশিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা রেকর্ড ৪.৫ কোটিতে পৌঁছেছে, যার মধ্যে নারী শিক্ষার্থীরা প্রায় অর্ধেক (৪৯.৭%)।
  • জেন্ডার প্যারিটি ইনডেক্স (Gender Parity Index): বর্তমানে এই সূচকটি ১.০৮। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন পুরুষের বিপরীতে ১০৮ জন নারী উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হচ্ছেন।
  • অনগ্রসর শ্রেণির অংশগ্রহণ: তফশিলি জাতি (SC) এবং তফশিলি উপজাতির (ST) নারীদের ক্ষেত্রে ভর্তির হার যথাক্রমে ৫১.৪% এবং ৭৫.৭% বৃদ্ধি পেয়েছে।

STEM ও নির্দিষ্ট বিষয়ের বিন্যাস:

  • STEM শিক্ষায় নারী: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিভাগে মোট শিক্ষার্থীর ৪৪% নারী।
  • সাধারণ বিজ্ঞান বনাম ইঞ্জিনিয়ারিং: STEM-এর মধ্যে নারীদের সিংহভাগই সাধারণ বিজ্ঞানে (যেমন- বায়োলজি, কেমিস্ট্রি), যেখানে তারা ৫৪.৬% সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিপরীতে, ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ মাত্র ৩১.১%, যা এখনো পুরুষশাসিত।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিঙ্গ বৈষম্য:

  • শিক্ষক অনুপাত: শিক্ষার্থীদের মধ্যে লিঙ্গ অনুপাত প্রায় ৫০-৫০ হলেও, প্রতি ১০০ জন পুরুষ শিক্ষকের বিপরীতে নারী শিক্ষকের সংখ্যা মাত্র ৮২ জন। এছাড়া শীর্ষ নেতৃত্বের পদগুলোতে নারীদের উপস্থিতি খুবই কম।

কর্মসংস্থান ও আয়ের বৈষম্য (2025 PLFS রিপোর্ট):

  • বেতনভুক্ত কর্মসংস্থান: নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মক্ষেত্রে পুরুষরা (২৬.৫%) নারীদের (১৮.২%) চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
  • আয়ের ব্যবধান: পুরুষদের গড় মাসিক আয় যেখানে ২৪,২১৭ টাকা, সেখানে নারীদের গড় মাসিক আয় মাত্র ১৮,৩৫৩ টাকা।
  • স্বনির্ভরতা ও অবৈতনিক শ্রম: প্রায় ৬৪.২% নারীকে ‘স্বনির্ভর’ (Self-employed) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, তবে এই পরিসংখ্যানের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের অবৈতনিক গৃহস্থালি বা কৃষিকাজের শ্রমও অন্তর্ভুক্ত থাকে।