ভাঙা হাট, চেনা আবেগের নতুন লড়াই: চার দলের অগ্নিপরীক্ষায় একুশের কলকাতা

21 July Controversy

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা: বাঙালির রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে ‘২১ জুলাই’ মানেই এক চেনা দৃশ্যপট। ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে মানুষের চেনা ঢল, লক্ষ লক্ষ কর্মীর ভিড় আর মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেনা হুঙ্কার। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে একুশে জুলাই এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এবার সময় বদলেছে, বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণও। রাজ্যে পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেস আজ দীর্ণ, বিভক্ত। দল ভেঙে তৈরি হয়েছে একাধিক উপদল। এবারের একুশে জুলাই তাই কেবল শহীদ তর্পণের দিন নয়, বরং বাংলার রাজনীতিতে কার পায়ের তলায় কতটা মাটি আছে, তা প্রমাণ করার এক মরণপণ লড়াই।

এবার আর ধর্মতলার সেই চেনা চত্বর নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা সরে গিয়েছে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের (তারামণ্ডল) পাশের রাস্তায়। কলকাতা হাইকোর্ট দর্শক সংখ্যা বেঁধে দিয়েছে মাত্র আড়াই হাজারে। যে ধর্মতলা থেকে মানুষের ঢল তারামণ্ডল পর্যন্ত এসে পৌঁছাত, আজ সেই তারামণ্ডলের চত্বরেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে তৃণমূল নেত্রীকে।

ভাঙা হাটে মমতার একাকী লড়াই ও আবেগ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এবারের লড়াইটা সবচেয়ে কঠিন। কারণ, একদা তাঁর যে সেনাপতিরা একুশে জুলাইয়ের মঞ্চ সফল করতে জান লড়িয়ে দিতেন—ফিরহাদ হাকিম, মদন মিত্র, অনুব্রত মণ্ডল, অরূপ বিশ্বাসের মতো প্রথম সারির নেতারা আজ আর তাঁর পাশে নেই। দলত্যাগের তালিকায় সর্বশেষ বড় সংযোজন মদন মিত্র। এই ‘ভাঙা হাটে’ দাঁড়িয়ে মমতা অবশ্য তাঁর চেনা লড়াকু মেজাজেই প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন।

তিনি সাফ জানিয়েছেন, ডেকোরেটর বা মাইকম্যানকে ভয় দেখিয়ে লাভ হবে না। প্রশাসন নিরপেক্ষ না থাকলে প্রয়োজনে খালি গলায়, রিকশায়, ঠেলা গাড়িতে কিংবা হকারদের ভ্যানে দাঁড়িয়েও তিনি বক্তৃতা দেবেন। দলত্যাগীদের কড়া ভাষায় ‘বেইমান’ ও ‘বাটপার নতুন নটবরলাল’ বলে আক্রমণ করে মানুষের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়েছেন মমতা। যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী থাকাকালীন ‘নো আইডি কার্ড, নো ভোট’ আন্দোলনের সেই চেনা আবেগকে উস্কে দিয়ে তিনি শহীদ পরিবারদের তাঁর সভাতেই আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রশ্ন একটাই—নেতৃত্বহীন এই ভাঙা হাটে সাধারণ তৃণমূল কর্মীরা দিদির আবেগে কতটা সাড়া দেবেন?

নব্য তৃণমূল ও ঋতব্রতর অস্তিত্বের লড়াই

অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনে মরিয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিদ্রোহী বিধায়কদের দল, যা রাজনৈতিক মহলে ‘নব্য তৃণমূল’ নামে পরিচিত। তারা এবার পুলিশের অনুমতি নিয়ে ধর্মতলার চেনা মাঠেই সভা করতে চলেছে। তাদের পাশে রয়েছেন ববি (ফিরহাদ), চন্দ্রিমা, মদন ও অনুব্রতর মতো হেভিওয়েটরা।

নব্য তৃণমূলের নেতাদের স্পষ্ট দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস কোনো একনায়কতন্ত্রের দল নয়, এটি গড়ে উঠেছিল অরুণ রায়ের মতো সাধারণ কর্মীদের সই এবং ত্যাগের ওপর ভিত্তি করে। করপোরেট মাফিয়াদের বদলে গ্রাউন্ড লেভেলের কর্মীদের প্রাধান্য দেওয়ার বার্তা দিয়ে তাঁরা মমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। একুশের মঞ্চ থেকে তাঁরা দলের তহবিল এবং খরচের হিসাব নিয়ে তদন্তের দাবি তুলতে চলেছেন। শহীদ পরিবারগুলি আসলে কার সঙ্গে রয়েছে, তা এই সভা থেকেই প্রমাণিত হবে বলে তাঁদের দাবি। তবে মমতার ক্যারিশম্যাটিক আবেগের বাইরে গিয়ে এই নেতারা কতটা জনসমর্থন টানতে পারেন, তা তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা।

চার কোণের লড়াই: এনসিপিআই ও কংগ্রেসের অবস্থান

তৃণমূলের এই ভাঙন শুধু দুই পক্ষে সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে চতুর্মুখী লড়াইয়ে। মমতাত্যাগী বিদ্রোহী সাংসদদের নিয়ে গঠিত হয়েছে নতুন দল NCPI (ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি অফ ইন্ডিয়া), যার নেতৃত্বে রয়েছেন কাকলী ঘোষ দস্তিদার। তবে ঋতপন্থী নব্য তৃণমূল ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, NCPI এবং AITC সম্পূর্ণ আলাদা দল। ফলে বিদ্রোহী সাংসদদের ধর্মতলার সভায় আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। স্বভাবতই, কাকলী ঘোষ দস্তিদারদের দলকেও নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য আলাদা রাস্তা খুঁজতে হচ্ছে।

এই ঘোলা জলে মাছ ধরতে এবং নিজেদের হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করতে ময়দানে নেমে পড়েছে প্রদেশ কংগ্রেসও। এবার শহীদ মিনারের পাদদেশে ২১ জুলাই পালন করার বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। একদা যুব কংগ্রেসের হাত ধরেই এই শহীদ দিবসের সূচনা হয়েছিল, সেই ইতিহাসকে হাতিয়ার করেই রাজপথে নামছে হাত শিবির।

উপসংহার: কার হাতে থাকবে একুশের উত্তরাধিকার?

সব মিলিয়ে, এবারের একুশে জুলাই কলকাতার বুকে এক বেনজির রাজনৈতিক নাটকের সাক্ষী হতে চলেছে। একদিকে রয়েছে ‘কালিঘাট তৃণমূল’ বনাম ‘কালিঘাট বিরোধী তৃণমূলের’ অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ, অন্যদিকে রয়েছে এনসিপিআই এবং প্রদেশ কংগ্রেসের নিজেদের প্রাসঙ্গিক প্রমাণের লড়াই।

ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে চেনা ভিড় ভাঙার পর, কলকাতার রাজপথ এবার কার পক্ষে রায় দেয়, সেটাই দেখার। এই চতুর্মুখী অগ্নিপরীক্ষায় যিনি সফল হবেন, আগামী দিনে বাংলার মূল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যে তাঁর দিকেই ঝুঁকবে, তা বলাই বাহুল্য।