একুশের আগে কালীঘাটে ভাঙন-কম্পন, তারকা-মোহের চড়া মাশুল কি দিতে হচ্ছে মমতাকে ?

Star MPs are parting ways with Mamata Banerjee.

বিশেষ প্রতিবেদন

গ্ল্যামারের চোরাবালি ও রাজনীতির রূঢ় জমিন

একুশে জুলাইয়ের শহিদ দিবসের মঞ্চ যখন ধর্মতলার মোড়ে প্রস্তুত হচ্ছে, যখন সভার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত কর্মীদের স্লোগানে মুখরিত চারদিক, ঠিক তখনই কালীঘাটের অন্দরে যে ফাটল ও কম্পন তৈরি হলো, তা আর স্রেফ জল্পনা বা বিরোধীদের অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মদন মিত্রের মতো দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত, রাজপথ কাঁপানো সৈনিকের শিবির বদল এবং রথের পুণ্য তিথিতে রাজ্যসভা থেকে অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের নাটকীয় ইস্তফা—তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসদীয় রাজনীতির তথাকথিত ‘তারকা-মডেল’-কে এক গভীর ও অস্বস্তিকর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিল।

২০১১ সালের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পটভূমিতে যখন চৌত্রিশ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটেছিল, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টলিউডের একঝাঁক সেলুলয়েড তারকাকে রাজনীতির অলিন্দে নিয়ে এসেছিলেন। রূপোলী পর্দার জনপ্রিয়তাকে ব্যালট বাক্সে রূপান্তরিত করার সেই কৌশলকে তখন অনেকেই ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস ও মহাকাল সাক্ষী, রাজনীতির রুক্ষ, ধূলিধূসরিত জমিতে সেলুলয়েডের গ্ল্যামার চিরকাল স্থায়ী হয় না। ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমা ফুরিয়ে গেলে, কিংবা শাসনের রাশ সামান্য শিথিল হলেই যে তারকারা সবার আগে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ‘চলন্ত নৌকা থেকে ঝাঁপ’ দেন, তা আজ আরও একবার প্রমাণিত। ববি বা অরূপের মতো খাস অনুগামীদের সাথে তৈরি হওয়া দূরত্ব এবং একের পর এক তারকার এই ক্ষোভ ও দলত্যাগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় কৌশলগত ভুল বা ‘হিমালয়ান ব্লান্ডার’ হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে।

বামপন্থীদের প্রাতিষ্ঠানিকতা বনাম তৃণমূলের তারকা-নির্ভরতা

বাংলার সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দীর্ঘ বাম শাসনে বিনোদন জগতের কলাকুশলীদের সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে আনার ক্ষেত্রে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা বা শুচিবায়ুগ্রস্ততা ছিল। বামফ্রন্ট সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রপরিচালক মৃণাল সেনকে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল বটে, তবে তা ছিল মূলত তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে সম্মান জানাতে। একইভাবে অভিনেতা বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়কে যখন সিপিএম প্রার্থী করেছিল, তাও ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। বামেরা কখনোই গ্ল্যামারকে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির বিকল্প হিসেবে ভাবেনি।

কিন্তু ২০১১ সালের পর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ ঘটে গায়ক কবীর সুমন, অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায় কিংবা চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরীর। বাঁকুড়ার মতো দুর্ভেদ্য বাম দুর্গে দাপুটে নেতা বাসুদেব আচারিয়াকে পরাস্ত করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যবহার করেছিলেন মুনমুন সেনের গ্ল্যামার কার্ড। সেই সূত্র ধরেই একে একে সংসদে ও বিধানসভায় এলেন শতাব্দী রায়, মিমি চক্রবর্তী, দেব, সায়নী ঘোষ, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, সোহম, সায়ন্তিকা কিংবা রাজ চক্রবর্তী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যেই বলতেন তিনি তারকাদের সিরিয়াল বা সিনেমার ভক্ত। টলিউডের এই ঝাঁক একুশের মঞ্চের সিংহভাগ আলো কেড়ে নিত। কিন্তু আজ যখন রাজনৈতিক জমি সংকটে, তখন এই গ্ল্যামার-ব্রিগেডের একটা বড় অংশ হয় ‘স্বেচ্ছা অন্তরালে’ চলে গেছেন, নয়তো প্রকাশ্যেই নেতৃত্বের সমালোচনা করছেন। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নতুন তারকারা যখন প্রকাশ্যেই অন্য শিবিরের প্রতি অনুকম্পা দেখান, কিংবা মিমি-সায়নীরা যখন দূরত্বের পাঁচিল তোলেন, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে আদর্শহীন জনপ্রিয়তার ভিত কতটা ঠুনকো।

কোয়েল মল্লিকের ইস্তফা: সংসদীয় রাজনীতির পরিহাস

এই গোটা অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় বিস্ময় এবং পরিহাসের নাম কোয়েল মল্লিক। দেশের মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার মহান শপথ নিয়ে তিনি রাজ্যসভায় পা রেখেছিলেন। অথচ পরিসংখ্যান ও সংসদের নথি বলছে, সাংসদ হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি একটি দিনও কক্ষের অধিবেশনে যোগ দেননি! রাজনীতির আঙিনায় এর চেয়ে বড় ফাঁকিবাজি আর কী হতে পারে? আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ১১ জুন ইস্তফার ইমেল পাঠানোর পর, রথের দিনে যখন তিনি সশরীরে রাজ্যসভার চেয়ারম্যানের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিতে এলেন, তার ঠিক আগে নিসপাল সিংকে সঙ্গে নিয়ে এক বিজেপি শীর্ষনেতার ড্রয়িংরুমে তাঁর উপস্থিতি কীসের ইঙ্গিত দেয়?

এটি প্রমাণ করে যে, বাংলার রাজনীতিতে এই সব তারকারা শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ ও গ্ল্যামারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যখনই দলের ওপর সংকটের মেঘ ঘনিয়েছে, কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার অঙ্ক মিলেনি, তখনই beauties ও নায়কেরা মানুষের রায় ও দলের আনুগত্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। বিনোদনের মানুষকে ক্ষমতার বৃত্তে টেনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ঐতিহাসিক ভুল করেছিলেন, আজ দলত্যাগের এই হিড়িক তারই অমোঘ প্রমাণ।

নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব এবং আদর্শগত চ্যুতি

এই ভাঙনের নেপথ্যে কেবল তারকাদের সুযোগসন্ধানী চরিত্রই দায়ী নয়, বরং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামোগত সংকটও সমানভাবে দায়ী। বর্তমানে দলটির ভেতরে ‘নবীন বনাম প্রবীণ’ বা ‘পুরনো তৃণমূল বনাম নব তৃণমূল’-এর যে ঠান্ডা লড়াই চলছে, মদন মিত্রের মতো নেতার ঋতব্রত শিবিরে যোগ দেওয়া তারই বহিঃপ্রকাশ। প্রবীণ নেতারা যখন দেখেন যে বছরের পর বছর জেল খেটে, লাঠি খেয়ে যারা দলটাকে দাঁড় করিয়েছেন, তাদের চেয়ে রূপোলী পর্দার নায়িকাদের গুরুত্ব কালীঘাটে বেশি—তখন দলের ভেতরে ক্ষোভের আগুন জ্বলবেই।

তারকারা রাজনীতিতে আসেন এক ধরণের প্রিভিলেজ বা বাড়তি সুবিধা নিয়ে। তারা বুথ স্তরের লড়াই চেনেন না, মিছিলে হেঁটে ঘাম ঝরান না। ফলে, দলের কঠিন সময়ে যখন ক্যাডারভিত্তিক লড়াইয়ের প্রয়োজন হয়, তখন এই তারকারা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। তৃণমূলের রাজ্যসভার সদস্য সংখ্যা ১৩ থেকে কমে ৯-এ নেমে আসা স্রেফ একটি গাণিতিক ক্ষতি নয়, এটি দলটির আদর্শগত দেউলিয়াত্ব এবং সাংগঠনিক দুর্বলতার এক নগ্ন দলিল।

শেষ কথা: কোন পথে পুনরুদ্ধার?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো আজ একাকীত্বের এক গভীর রাজনৈতিক অন্ধকার থেকে উপলব্ধি করছেন যে, জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে ভোট বৈতরণী পার হওয়া গেলেও স্থায়ী সংগঠন তৈরি করা যায় না। তারকাদের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি অতীতে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার চড়া মাশুল দিতে হচ্ছে আজ। এই তারকারা দলের রাজনৈতিক জমিকে এতটাই আলগা করে দিয়েছেন যে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো এখন এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ।

ধর্মতলার শহিদ মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হয়তো আবারও হুঙ্কার ছাড়বেন, ঘুরে দাঁড়ানোর ডাক দেবেন। কিন্তু বাংলার প্রাজ্ঞ ভোটার এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আজ এই প্রশ্নই তুলছেন—ভবিষ্যতে কি আবার কোনো নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে কালীঘাট টলিউডের শরণাপন্ন হবে? নাকি এই চড়া মাশুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো আবার সেই মাটি কামড়ানো, রোদ-জল-ঝড় সহ্য করা খাঁটি রাজনৈতিক কর্মীদের ওপরই ভরসা রাখবেন? উত্তরটা হয়তো সময়ই দেবে, তবে বাংলার রাজনীতিতে তারকা-মোহের এই পতন এক দীর্ঘস্থায়ী ও শিক্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেল।