“আমি সব রকম মৌলবাদের বিরুদ্ধে, কোনো ধর্ম বা কোনো মতাদর্শই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়”:তসলিমা

Back in Kolkata after 19 years: Taslima Nasrin’s emotional message

বিশে্ষ প্রতিবেদন

১৯ বছর পর কলকাতায়: তসলিমা নাসরিনের আবেগঘন বার্তা

২০০৭ সালের ২২ নভেম্বর এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যে শহর তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, দীর্ঘ ১৯ বছর পর ২০২৬ সালের অগস্টে সেই কলকাতায় পা রেখেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তসলিমা নাসরিন। কলকাতা ছেড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অবশেষে নিজের ‘ভাষার শহরে’ ফেরার আনন্দ—সব মিলিয়ে তাঁর বক্তব্য হয়ে ওঠে পরম আবেগের এক ক্যানভাস।

১. নির্বাসনের যন্ত্রণা ও স্বদেশের দ্বার রুদ্ধ হওয়া

অগস্ট মাসকে জীবনের এক অদ্ভুত অধ্যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন:

  • অগস্টের সমীকরণ: “১৯৯৪ সালের ৮ অগস্ট বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছিল আমাকে। অগস্ট আমার জন্মের মাস, অগস্ট আমার নির্বাসনের মাস। আজ থেকে অগস্ট আমার প্রত্যাবর্তনের মাসও।”
  • স্বদেশের দরজাসংক্রান্ত আফসোস: “আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল তৎকালীন সরকার। রাতের অন্ধকারে স্বদেশের দরজা আমার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তার পর একের পর এক সরকার এসেছে, কিন্তু সেই দরজা আর খোলেনি।”

২. ঘর হারানোর হাহাকার ও কলকাতার আশ্রয়

নিজের ভাষার শহরে ফেরার স্বস্তি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন:

  • ঠিকানা হারানোর কষ্ট: “এক বাংলায় আমার জন্ম, আর এক বাংলায় হারিয়ে যাওয়া ঘর খুঁজে পেয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত একজন বাঙালি লেখকের জন্য দুই বাংলার কোথাও একটা ঘরও রইল না। ইউরোপ আমাকে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, আশ্রয় দিয়েছে; কিন্তু সেই আশ্রয় কখনও ‘ঘর’ হয়ে উঠতে পারেনি।”
  • অন্যায্য নির্বাসন: “২০০৭ সালে ২২ নভেম্বর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার আমাকে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। আমি কোনও অপরাধ করিনি। কোনও আদালত আমাকে নির্বাসনের নির্দেশ দেয়নি। তবুও মৌলবাদীদের হুমকির মূল্য দিতে হল আমাকে।”

৩. পুলিশি নিরাপত্তা ও মুক্ত চিন্তার স্বপ্ন

কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পর থেকে সঙ্গে থাকা কড়া নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন:

  • বেদনাদায়ক সত্য: “একজন লেখককে তাঁর ভাষার শহরে আসতে পুলিশের পাহারার প্রয়োজন হওয়াটাই আমাদের কাছে বেদনাদায়ক সত্য। আমি এমন একটা দিনের স্বপ্ন দেখি, যে দিন কোনও লেখককে পুলিশের পাহারায় চলতে হবে না, ভিন্ন মত পোষণের জন্য কাউকে দেশ ছাড়তে হবে না।”

৪. দরজা খোলার ইতিহাস ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা

দীর্ঘ ১৯ বছরের বন্ধ দরজা খুলে যাওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের ভূয়সী প্রশংসা ও ধন্যবাদ জানিয়ে তসলিমা বলেন:

  • ইতিহাসের বিচার: “ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল। ইতিহাস মনে রাখবে কারা দরজা খুলেছিল। নির্বাসিত মানুষের ক্যালেন্ডারে বছর শুধু সময় নয়, প্রতিটি বছর একটি বন্ধ দরজা। প্রতি মাস অপেক্ষার, প্রতিটি দিন নিজের ঠিকানা হারানোর দুঃখের।”
  • প্রত্যাবর্তনের বার্তা: “সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পর কলকাতার মাটিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে আমি শুধু একটি শহরে ফিরে আসিনি, ফিরে এসেছি হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়ে। বন্ধ দরজাও চিরকাল বন্ধ থাকে না। অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী নয়।”

৫. মৌলবাদ ও দেওয়ানি বিধির স্পষ্ট অবস্থান

সমস্ত রকম গোঁড়ামি ও ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে লেখিকা বলেন:

  • সংস্কারের বার্তা: “আমি মুসলিম সমাজ নিয়ে এত বলি, কারণ আমি ওই সমাজেরই মেয়ে। ইসলামী আইনে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য আমি দেখেছি। ইসলাম সম্পর্কে সত্য কথা বলা ইসলামবিদ্বেষ নয়। আমরা সমালোচনা করি ধ্বংস করার জন্য নয়, সংস্কার করার জন্য।”
  • অভিন্ন দেওয়ানি বিধি: “ভারত, বাংলাদেশ— দু’দেশেই ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি দরকার। তবে তা সংখ্যাগুরুর ধর্মের বিধান নয়; সংবিধান, মানবাধিকার এবং সমানাধিকারের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া দরকার।”

৬. ভালোবাসার শহরে ফেরা: শেষ কথা

বক্তব্যের শেষ লগ্নে কলকাতা শহরের প্রতি আবেগ উগড়ে দিয়ে তিনি বলেন:“কলকাতা, তোমাকে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন? আমি কী অপরাধ করেছিলাম? আমার চোখে জল আছে, অভিমান আছে, কিন্তু ভালোবাসাও আছে। যে শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল, সেই শহরেই আমি ফিরে এসেছি।নির্বাসন আমার ঘর কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু আমার ভাষা কেড়ে নিতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত কোনও মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।”