The current situation of pellet gun victims in Kashmir.
বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন (সূত্র: দি হিন্দু)
দিল্লিতে ছাত্র আন্দোলন ঠেকাতে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছিল কার নির্দেশে, তা নিয়ে সংসদ তোলপাড়। কার নির্দেশে পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিয়ে সংসদে বিরোধীরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের স্পষ্ট বিবৃতি দাবি করেছেন। অমিত শাহ সংসদে এখনো পর্যন্ত কার্যত নীরব এবং তিনি হাউসে আসছেন না। উল্লেখ্য, পেলেট গান প্রথম খবরের শিরোনামে আসে কাশ্মীরে আন্দোলনকারীদের রুখতে এর ব্যাপক ও নির্মম ব্যবহার নিয়ে। বর্তমান এই রাজনৈতিক খবরের প্রেক্ষিতে আজও কেমন আছেন কাশ্মীরের সেই পেলেট গানের দগদগে ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষেরা? তা নিয়েই বিশেষ প্রতিবেদন তুলে ধরেছেন ‘দি হিন্দু’-র সাংবাদিক।
১. এক প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি ও নির্মম বাস্তব
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৬ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে যখন আন্দোলনের উত্তাপ চরমে, তখন শ্রীনগরের পুরনো শহরের রাজপথে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন জাভেদ খান (নাম পরিবর্তিত)। হঠাৎ একটি পেলেট গান থেকে ছোড়া গুলি এসে লাগে তার চোখে। জাভেদের বর্ণনায়, মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যায় এবং মনে হতে থাকে যেন চোখের ভেতরে একটি “লাল গরম লোহা” ঢুকে গেছে। এই ঘটনায় তিনি এক চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারান।
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, দীর্ঘ এক দশক পেরিয়ে গেলেও জাভেদ খান সেই মর্মান্তিক দিনের স্মৃতি ভুলতে পারেননি। তিনি জানান, আজও তার চোখে আগুনের মতো জ্বালাপোড়ার অনুভূতি ফিরে আসে। বর্তমানে শ্রীনগরের মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসাধীন থাকা জাভেদ একা নন; তিনি কাশ্মীরের সেই হাজার হাজার পেলেট গান ভিকটিমের একজন, যারা শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক ট্রমা নিয়ে প্রতিনিয়ত ওফথালমোলজিস্ট (চোখের ডাক্তার) এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের কাছে ধাওয়া করছেন।
২. ৬,০০০ স্থানীয় অধিবাসী প্রভাবিত: পরিসংখ্যান ও গবেষণা
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৮ সালে গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজ, শ্রীনগর (Government Medical College, Srinagar) কর্তৃক পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় এই ক্ষতিকর অস্ত্রের ভয়াবহ মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তুলে ধরা হয়, যা ২০১৬ সালে আনুমানিক ৬,০০০ স্থানীয় বাসিন্দাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল।
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, এই গবেষণায় মোট ৩৮০ জন পেলেট গান আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর বিশ্লেষণ করা হয় (যার মধ্যে ৩৩৩ জন পুরুষ এবং ৪৭ জন নারী)।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী:
- ৫৭.৬৩% (২১৯ জন): সাধারণ বা হালকা চোট পেয়েছিলেন।
- ৪২.৩৭% (১৬১ জন): মারাত্মক বা গুরুতর আঘাতের (Grievous Injury) শিকার হন।
৩. শারীরিক আঘাতের ধরন ও সংজ্ঞা
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, তৎকালীন ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩২০ ধারা অনুযায়ী গুরুতর আঘাতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল:
- চোখের দৃষ্টিশক্তি বা কানের শ্রবণশক্তি চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
- অঙ্গহানি বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া।
- হাড় ভেঙে যাওয়া বা জয়েন্ট নষ্ট হওয়া।
- মুখমণ্ডল বা শারীরিক অবয়ব বিকৃত হয়ে যাওয়া।
অন্যদিকে আইপিসি-র ৩১৯ ধারা অনুযায়ী ৩২৩টি কেসকে ‘সাধারণ আঘাত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, ৩৮০ জন আক্রান্তের মধ্যে ২৬০ জন চোখে আঘাত পেয়েছিলেন এবং ১০০ জন হাত বা পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল।
৪. মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, যারা মারাত্মক শারীরিক আঘাত পেয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ চরম মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন।
চোখে আঘাতপ্রাপ্তদের মানসিক অবস্থা (দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে):
- ৩০.৩৮%: বিষণ্ণতা (Depression)-এ ভুগছেন।
- ১৬.৯২%: অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার (Adjustment Disorder)-এ আক্রান্ত।
- ১৩.০৮%: প্যানিক ডিসঅর্ডার (Panic Disorder)-এ ভুগছেন।
- ১০.৭৭%: পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এ আক্রান্ত।
হাত ও পায়ে আঘাতপ্রাপ্তদের মানসিক অবস্থা (দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে): অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঘাত পাওয়া ১০০ জন রোগীর মধ্যে ২৯% ক্ষেত্রে কোনো মানসিক সমস্যা পাওয়া না গেলেও, বাকি অংশটি উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার মিশ্রণ (Mixed Anxiety with Depression), নির্দিষ্ট ফোবিয়া (Specific Phobias), হাইপোম্যানিয়া, জিএডি (GAD), প্যানিক ডিসঅর্ডার, অ্যাডজাস্টমেন্ট ডিসঅর্ডার এবং মাদকাসক্তিতে (Substance Abuse) ভুগছেন।
৫. আক্রান্তদের বয়স ও পারিবারিক কাঠামো
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, পেলেট গানের শিকার হওয়া সিংহভাগ মানুষই ছিল তরুণ ও কিশোর বয়সের।
- ১০ থেকে ২০ বছর বয়স: ১৫৫ জন (৪০.৭৯%)
- ২১ থেকে ৩০ বছর বয়স: ১৫৪ জন (৪০.৫৩%)
অর্থাৎ, মোট আক্রান্তের প্রায় ৮১.৩২% মানুষই ছিলেন ১০ থেকে ৩০ বছর বয়সী।
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, মানসিক সমস্যায় ভোগা রোগীদের পারিবারিক পটভূমি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে:
- ৭৫.২৩% রোগী একক পরিবারের (Nuclear Family) সদস্য।
- ১৮.৮৯% রোগী যৌথ পরিবারের (Joint Family) সদস্য।
- ৫.৮৮% রোগী সম্প্রসারিত পরিবারের (Extended Family) সদস্য।
৬. ওফথালমোলজির গবেষণা ও অস্ত্রের ইতিহাস
দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ওফথালমোলজি’ (Indian Journal of Ophthalmology)-তে ২০২২ সালে প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০১০ সালের পেলেট ভিকটিমদের মধ্যে ৩০% চোখে আঘাত এবং ৫০% ‘ওপেন গ্লোব ইনজুরি’-র (Open Globe Injuries) শিকার হয়েছিলেন।
পেলেট শটগানের কার্যকারিতা (দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে): এক একটি পেলেট শটগান কার্তুজে প্রায় ৫০০টি পর্যন্ত ছোট ছোট সীসার গুলি বা পেলেট থাকে। তীব্র গতিবেগ ও ক্ষুদ্র আকারের কারণে এগুলো মানবদেহে প্রবেশ করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফুটো করে ফেলে বা চোখের গভীরে স্থায়ীভাবে আটকে যায়। দি হিন্দু প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১০ সালের আগস্টে কাশ্মীরের রাস্তায় হিংসাত্মক আন্দোলন (যেখানে প্রায় ১০০ জন সাধারণ মানুষ মারা যান) নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রথম পেলেট শটগান চালু করা হয়েছিল।
