আড়ালে কোন পাঠ? মাদ্রাসা বিতর্ক, খারিজি শিক্ষা এবং বন্ধের নেপথ্য সমীকরণ

Khariji Madrasa controversy in west Bengal

বিশেষ প্রতিবেদন

স্কুল মানেই ইংরেজি হরফে ‘স্কুল’, আর আরবিতে তাকেই বলা হয় ‘মাদ্রাসা’। অথচ একটি শব্দের ফেরেই সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে পাহাড়প্রমাণ ভুল ধারণা। ‘মাদ্রাসা’ শুনলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর কিংবা অন্ধকার কোনো ঘরের ছবি। অথচ একটু তলিয়ে দেখলেই স্পষ্ট হয়, এই শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা, সাংবিধানিক অধিকার আর কয়েক লক্ষ গরিব পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। আর সম্প্রতি রাজ্যে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নোটিশ এবং ১০০টি মাদ্রাসাকে শোকজ করার পর সেই বিতর্ক ফের চলে এসেছে তুঙ্গে।

প্রশাসনের তথ্য বলছে, রাজ্যে প্রায় ২,১৩২টি মাদ্রাসা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে চললেও, রেজিস্ট্রেশন বা বোর্ডের অ্যাফিলিয়েশন ছাড়াই চলছে প্রায় ২,৩৯৬টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি কোপ পড়েছে মালদহে (প্রায় ৪৪-৪৫টি), উত্তর দিনাজপুরে (প্রায় ৩৭টি), দক্ষিণ ২৪ পরগনায় (প্রায় ৩২টি) এবং মুর্শিদাবাদ ও নদিয়ায় (প্রায় ২৫টি করে)। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই অনুমোদনহীনতা কি নতুন কোনো অপরাধ, নাকি সাংবিধানিক অধিকারের স্বাভাবিক চর্চা?

পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসার ধরন: পাঠক্রম থেকে সরকারি অনুদান

পশ্চিমবঙ্গে মূলত তিন ধরনের মাদ্রাসা রয়েছে। প্রতিটি স্তরের গঠনতন্ত্র, পঠনপাঠন এবং সরকারি অনুদানের নীতি সম্পূর্ণ আলাদা।

১. অনুমোদন ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত মাদ্রাসা (হাই মাদ্রাসা ও সিনিয়র মাদ্রাসা): মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সমান্তরাল পর্ষদের অধীনে চলা এই হাই মাদ্রাসাগুলির পাঠ্যক্রম সাধারণ স্কুলের মতোই। মাধ্যমিকের সাতশো নম্বরের আধুনিক পরীক্ষার সঙ্গে এখানকার পড়ুয়াদের অতিরিক্ত একশো নম্বরের ‘ইসলাম পরিচয়’ ও তৃতীয় ভাষা হিসেবে আরবি পড়তে হয়, যা মোট নম্বরের সঙ্গে যোগ হয় না (বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের সংস্কৃত শিক্ষার বিকল্প হিসেবে একে ভাবা যেতে পারে)। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরেও পড়াশোনা সম্পূর্ণ সাধারণ কাউন্সিলের নিয়মে হয়। মজার বিষয় হলো, সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত এই সমস্ত হাই মাদ্রাসার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষক ও কর্মীই অ-মুসলিম এবং পড়ুয়াদের মধ্যেও অনেকে অন্য ধর্মের। সরকারি বেতন কাঠামোয় শিক্ষকদের বেতন সাধারণ স্কুল শিক্ষকদের সমান। অন্যদিকে, সিনিয়র মাদ্রাসার আলিম (মাধ্যমিক) ও ফাজিল (উচ্চ মাধ্যমিক) স্তরে ধর্মীয় শিক্ষার ভাগ কিছুটা বেশি থাকে।

২. অনুমোদনপ্রাপ্ত কিন্তু সরকারি অনুদানে বঞ্চিত মাদ্রাসা: রাজ্যে এই ধরনের মাদ্রাসার সংখ্যা প্রায় ২৩৫টি। মাদ্রাসা পর্ষদের পাঠক্রম ও নিয়মেই এগুলি চলে, কিন্তু সরকারি কোনো অনুদান পায় না। বিভিন্ন দান এবং পড়ুয়াদের বেতনের ওপর নির্ভর করেই এদের বেঁচে থাকতে হয়।

৩. অনুমোদনহীন খারিজি মাদ্রাসা: এক দশক আগে বর্ধমানে খা্গড়াগড় বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঘটনায় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে এই তৃতীয় ধরনটিকে নিয়ে। ‘খারিজি’ কথার অর্থ ‘বাহিরে’, অর্থাৎ সরকারি অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। রাজ্যে আনুমানিক প্রায় পাঁচ হাজার এমন মাদ্রাসা রয়েছে।

খারিজি মাদ্রাসা: গরিবের আশ্রয় নাকি অন্য কিছু?

খারিজি মাদ্রাসার পড়ুয়ারা মূলত অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা ও গরিব মুসলিম পরিবারের সন্তান। পরিবারের লক্ষ্য থাকে সন্তানকে হাফেজ, ইমাম বা মোয়াজ্জেম তৈরি করা। অধিকাংশ খারিজি মাদ্রাসাই আবাসিক হওয়ায় অনাথ বা হতদরিদ্র শিশুরা প্রায় বিনা খরচে দু’বেলা অন্ন সংস্থানের সুযোগ পায়। বাড়ি বাড়ি থেকে সংগৃহীত ‘দান’ বা ‘জাকাত’-এর টাকায় মসজিদ লাগোয়া ছোট ছোট কক্ষে এই প্রতিষ্ঠানগুলি চলে। এখানে মূলত আরবি, এবং ধর্মশিক্ষার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বাংলা, ইংরেজি ও অঙ্কের পাশাপাশি কোন কোন কোন মাদ্রাসায় কম্পিউটার শিক্ষাও দেওয়া হয়। কিন্তু খারিজি মাদ্রাসাগুলির মূল সমস্যা হলো যোগ্য নজরদারির অভাব। আর্থিক সাহায্য তো দূরের কথা, সরকারি বা সমাজের সচেতন অংশের ন্যূনতম নজরদারিও এখানে থাকে না। অতীতে বর্ধমানের শিমুলিয়া মাদ্রাসা বা সম্প্রতি মুর্শিদাবাদ-বীরভূমের কিছু মাদ্রাসার বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় স্তরেও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অনুমোদনহীন মানেই কি ‘অবৈধ’?

এখানেই সংবিধানের মূল সুরটি অনুধাবন করা দরকার। ভারতীয় সংবিধানের ৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশের সংখ্যালঘুদের নিজ পছন্দমতো ‘ধর্ম শিক্ষা কেন্দ্র’ খোলার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। খারিজি মাদ্রাসাগুলির সরকারি কোনো অনুমোদন বা অনুদান না থাকলেও, সংবিধানগতভাবে এই কেন্দ্রগুলি চালানোর সম্পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। কাজেই অনুমোদন নেই মানেই সেগুলি ‘অবৈধ’ বা ‘সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর’—এমন তকমা দেওয়া বিভ্রান্তিকর। দেশজুড়ে যেমন বেদ, রামায়ণ, মহাভারত পড়ানোর বহু টোল বা চতুষ্পাঠী, সরস্বতী শিক্ষামন্দির, সরকারি অনুদান বা নিয়মের বাইরে নিজস্ব পরিসরে চলে, তেমনই খারিজি মাদ্রাসাও একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় শিক্ষার পরিসর। ধর্মশিক্ষাকে এক লপ্তে সন্ত্রাসী বলে দাগিয়ে দেওয়া বৈষম্যমূলক।

তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ বছরের পর বছর ধরে খাড়াগড় কান্ড বা শিমুলিয়া মাদ্রাসার তদন্ত করেও কোনো বড়সড় জঙ্গি নেটওয়ার্কের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরতে পারেনি। কিছু মোবাইল, সিমকার্ড বা প্রাথমিক আরবি বই পাওয়ার মতো বিচ্ছিন্ন অসঙ্গতিকে কেন্দ্র করে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা এবং তার সঙ্গে জড়িত লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া, শিক্ষক ও পরিচালনা সমিতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো কি সুবিচার? অপরাধীর কোনো ধর্ম হয় না, তাই দু-একজনের কাজের দায় একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপানো যায় না।

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমাজে যে কুসংস্কার বা ভীতি রয়েছে, তার বড় কারণ অজ্ঞতা। হাই মাদ্রাসাগুলির সঙ্গে আধুনিক স্কুলের কোনো পার্থক্যই নেই। আর খারিজি মাদ্রাসাগুলি সরকারি অনুদানের মুখাপেক্ষী না হয়ে সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সাংবিধানিক অধিকারে সমাজের প্রান্তিক শিশুদের পড়াশোনা ও আশ্রয়ের সংস্থান করে চলেছে। তাই প্রশাসনিক অনিয়ম বা পরিকাঠামোর ত্রুটি সংশোধনের নামে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে সন্দেহ বা বুলডোজারের মুখে ফেলা কতটা যুক্তিযুক্ত, এখন সেটাই সবথেকে বড় প্রশ্ন।