বিশে্ষ প্রতিবেদন
Legal battle over the Collectorate Mosque in Saharanpur
উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট চত্বর। প্রশাসনিক ব্যস্ততা, হাকডাক আর নথিপত্র নাড়াচাড়ার চেনা শব্দের ভিড়ে একটি জায়গা ছিল বড্ড শান্ত—প্রশাসনের নাকের ডগায় থাকা শতাব্দীপ্রাচীন এক মসজিদ। পাঁচ ওয়াক্ত আজানের ধ্বনিতে যেখানে মুখরিত থাকত চারপাশ, আজ সেখানে শুধুই ধ্বংসস্তূপ আর দীর্ঘশ্বাস। আইনি লড়াইয়ের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মানচিত্রে যার ঠিকানা আজ কেবলই অতীত।
ইতিহাসের পাতা ও ইটের শেকড় সাহারানপুরের এই মসজিদটি নেহাত কোনো সাধারণ মসজিদ ছিল না। স্থানীয় মানুষের আবেগ আর বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এর নাম। দীর্ঘকাল ধরে কালেক্টরেট চত্বরের ভেতরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদটি ওয়াক্ফ রেজিস্টারেও নথিভুক্ত ছিল বলে দাবি মামলাকারীদের। তৎকালীন নথিপত্র বলছে, সম্পত্তিটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ওয়াহিদ খান ও ইয়াকুব খানের মতো স্থানীয় ব্যক্তিত্বদের নাম। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই জমিতে ধর্মীয় উপাসনা চললেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের নজর পড়ে এই চত্বরের ওপর। সরকারি নথিতে জমিটি কালেক্টরেট কাচারির নামে অন্তর্ভুক্ত থাকার দাবি করা হলেও, এর শেকড় কতটা গভীর, তা নিয়ে বহু দিন ধরেই চাপা অসন্তোষ ছিল।
বিতর্কের সূত্রপাত ও বুলডোজারের থাবা ঝামেলার শুরু গত ১৬ জুলাই। উত্তরপ্রদেশ পাবলিক প্রিমিসেস আইনের জুজু দেখিয়ে সাহারানপুরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট ৩১৫ বর্গমিটার আয়তনের ওই মসজিদটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। শুধু ভাঙার নির্দেশই নয়, বুলডোজার চালানোর খরচের নামে মসজিদ পরিচালন কমিটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ৬ কোটি ৪১ লক্ষ টাকার এক আকাশছোঁয়া জরিমানা!
প্রশাসনের এই খড়্গহস্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গেই জেলা আদালতের দ্বারস্থ হন মসজিদ কমিটি। কিন্তু গত ২ সেপ্টেম্বর সেই আইনি সুরক্ষাও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, যখন জেলা বিচারক কমিটির আবেদন খারিজ করে দেন। আইনি নোটিশের তোয়াক্কা না করে গত ৫ সেপ্টেম্বর ঝটিকা অভিযানের মতো বুলডোজার চালিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় মসজিদটি। যে মাটিতে সেজদা দিয়ে কেটেছে মানুষের প্রজন্মের পর প্রজন্ম, এক পলকে তা পরিণত হয় ইটের গুঁড়ো আর ধুলোয়।
সরকার বনাম মামলাকারী: যুক্তির লড়াই হাই কোর্টে এই মামলার সওয়াল-জওয়াবে উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী আশিস কুমার সিং প্রশ্ন তুলেছেন সবচেয়ে মৌলিক জায়গাটিতে—জমির মালিকানা নিশ্চিত না করে কীভাবে একটি ধর্মীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়া হলো? আপিল আদালত ব্রিটিশ আমলের দোহাই দিয়ে যে দাবি করেছে, তাকে ভুল বলে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওয়াক্ফ রেজিস্টারে নথিভুক্ত থাকার পরও প্রশাসন কেন সেই আইনি সুরক্ষা মানল না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, উত্তরপ্রদেশ সরকারের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল মনিশ গোয়েল পাল্টা যুক্তি দিয়ে আদালতের নজর ঘুরিয়েছেন অন্য দিকে। সরকারের দাবি, মামলাকারীদের অবস্থানই পরস্পরবিরোধী—কখনও একে জমিদারের সম্পত্তি বলা হচ্ছে, আবার কখনও ওয়াক্ফ সম্পত্তি। তাছাড়া সুন্নি সেন্ট্রাল ওয়াক্ফ বোর্ডকে মামলায় পক্ষ না করার বিষয়টিও তুলে ধরেছে প্রশাসন। সরকারের সাফাই, ওয়াহিদ খান ও ইয়াকুব খানের নাম সংক্রান্ত নথিপত্রগুলি আদতে ‘ভুয়ো এন্ট্রি’, এবং জমিটির মালিকানার সপক্ষে কোনো বৈধ প্রমাণই দিতে পারেনি কমিটি।
আশা ও নিরাশার মাঝে হাই কোর্টের ভূমিকা মসজিদ তো মাটিতে মিশে গেছে ৫ সেপ্টেম্বরই। কিন্তু আইনের লড়াই তো থেমে থাকেনি। ইমারত ভাঙা গেলেও মানুষের অধিকার আর আইনি প্রশ্নগুলোকে কি এত সহজে ধামাচাপা দেওয়া যায়?
এলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারপতি রোহিত রঞ্জন আগরওয়ালের সাম্প্রতিক নির্দেশ সেই লড়াইয়ে এক চিলতে স্বস্তি এনে দিয়েছে। আদালত উত্তরপ্রদেশ সরকারকে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে পুরো বিষয়টি নিয়ে তাদের জবাব তলব করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, মসজিদ কমিটির ওপর চাপিয়ে দেওয়া সেই ৬ কোটিরও বেশি টাকার জরিমানা আদায়ের ওপর আগামী ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্থগিতাদেশ জারি করেছে আদালত।
এখন একটাই প্রশ্ন—যে মসজিদ মাটির নিচে তলিয়ে গেছে, আইনের কাগজ আর নথিপত্রের টানে কি তার সম্মান ফিরে আসবে? সাহারানপুরের ভাঙা ইটের স্তূপ আর আশাহত মানুষের নজর এখন আকুল হয়ে তাকিয়ে আছে আগামী ১২ অক্টোবরের দিকে। সত্যের পাল্লা শেষ পর্যন্ত কার দিকে ভারী হবে, উত্তর দেবে হাই কোর্টের পরবর্তী রায়।
